আইভীই ভরসা দৃষ্টি শামীমে

  • এবারো দেশের প্রথম নারী মেয়র আইভীই ভরসা
  • বেলা শেষে হিন্দুদের প্রায় দু’লাখ ভোটের হিসাব 
  • মাঠে শামীম ওসমানের খেলায় সবার চোখ
  • শামীম ওসমান ইস্যুতে বিরক্ত  ডা. আইভী
  • তৈমূরের প্রচারণায় আকরাম, পরিবর্তনের বাণী

মাত্র দু’দিন বাকি। প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত শীতলক্ষ্যাপাড়ের শিল্পনগরীর সিটি কর্পোরেশনে তৃতীয়বারের ভোটযুদ্ধের। ১৯৮৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয়েছিল রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত এই নারায়ণগঞ্জ জেলা। ১২৭০-এর দশক থেকে পূর্ববঙ্গে স্বাধীন হিন্দু রাজত্বের অবসানের (১৩০২) পূর্ব পর্যন্ত এই নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ-ই ছিল বাংলার রাজধানী। দেশের বাণিজ্যে ও সমপ্রীতির  জন্য নারায়াণগঞ্জ উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কদমরসূল ও মদনগঞ্জে গড়ে ওঠে বাণিজ্যিক অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক নদীবন্দর। ভোট এলে এ জেলায় বেড়ে যায় হিন্দুদের কদর। 

পড়ে যায় জাতীয় নির্বাচনের ছায়া। ছয় বছর আগের সর্বশেষ শুমারিতে জানা যায়, প্রায় দেড় লাখ হিন্দু ভোটার রয়েছেন এখানে। বর্তমানে যার সংখ্যা প্রায় দু’লাখ। এখানকার সংসদ সদস্য সাবেক মেয়র ও সব দলই যুগযুগ থেকে নারায়াণগঞ্জে হিন্দুদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখে। হিন্দুরাই বেলা শেষে বড় আকারের ভোট ব্যাঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। ১৬ তারিখে ভোট নিয়ে বাড়ছে দৌড়ঝাঁপ। সময়ের সাথে বাড়ছে নির্বাচনি উত্তাপ। চলছে আলোচনা-বিশ্লেষণ। সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও আগ্রহ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও বিএনপির অব্যাহতিপ্রাপ্ত নেতা তৈমূর আলম খন্দকারকে ঘিরে। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে সাত মেয়র প্রার্থীসহ ১৮৯ প্রার্থীর প্রচারণায় উৎসবমুখর নগরী। আচরণবিধি লঙ্ঘন ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবেই চলছে প্রচারণা। বাকযুদ্ধ নির্বাচনি মাঠ গরম হলেও এখনো পরিস্থিতি  অশান্ত হয়নি।  

এবারো আইভীই ভরসা : ২০১১ সালের ৫ মে নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও কদমরসূল এ তিনটি পৌরসভা বিলুপ্ত করে ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন। একই বছর ৩০ অক্টোবর প্রথমবারের মতো সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তখন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শামীম ওসমানকে পরাজিত করে সিটির প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী, যিনি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে আইভী বিলুপ্ত হওয়া নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই নির্বাচনে ভোটের কয়েক ঘণ্টা আগে মাঠ ছেড়ে যান বিএনপির প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর যখন দ্বিতীয় নির্বাচন হয়; তখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন অনুযায়ী মেয়র পদপ্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। সেই নির্বাচনে ডা. আইভী প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিদলীয় প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে সাড়ে ৭৯ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে পুনরায় মেয়র পদে নির্বাচিত হন। এবার তৃতীয়বারের মতো মেয়র পদে লড়ছেন আওয়ামী লীগের এই প্রভাবশালী নেতা। নারায়াণগঞ্জের মানুষের মুখে মুখে এখনো একটিই বাণী— আইভীই একমাত্র ভরসা ভোটারদের। 

শামীম ওসমানের খেলায় সবার চোখ : ‘শামীম ওসমান আওয়ামী লীগের শক্তির প্রতীক’ কয়েক বছর আগে কথাটি বলেছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী। আসলেই যে তিনি শক্তির প্রতীক সেটা আবারো প্রমাণিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে। আওয়ামী লীগ বনাম স্বতন্ত্র বিএনপি নেতার ভোটযুদ্ধে বারবার উঠে আসছিল শামীম ওসমানের নাম। যদিও শুরু থেকেই তিনি ছিলেন নিশ্চুপ। তার ভাষায়, হিমালয়সম কষ্ট বুকে নিয়ে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন। সমপ্রতি আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে নৌকার পক্ষে মাঠে নামার। এমন ঘোষণার পরও তার উপর আস্থা জাগেনি। তাকেসহ সকল অনুসারীদের রাখা হয়েছে নজরে। শুধু নিজদল আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরাও দৃষ্টি রেখেছেন। আইভীর কর্মীসমর্থকরা বলছেন, নৌকার প্রার্থীর প্রচারে নারায়ণগঞ্জ-৪ (সিদ্ধিরগঞ্জ-ফতুল্লা) আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের অনুসারীদের দেখা যাচ্ছে না। কয়েকদিন আগে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হাতি প্রতীকের প্রার্থী বিএনপির পদ হারানো তৈমূর আলম খন্দকারকে ‘গডফাদার’ শামীম ওসমানের প্রার্থী বলে অভিযোগ তোলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী। সমপ্রতি নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। অভিযোগ ছিল আইভীর পক্ষে কাজ না করার। যারা সবাই ছিল শামীম ওসমানের ভক্ত। তবে নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় নেতাদের কানেও ফিস ফিস করে বলা হয়েছে, শামীম ওসমানের নীরবতা ভোটের মাঠে ক্ষতির কারণ হবে। দলীয় প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী প্রচারণার শুরুতে বলেছেন, তিনি (শামীম) আমার বড় ভাই, আমাদের দলের নেতা। এমপি হওয়ার কারণে তিনি সরাসরি মাঠে নামতে পারছেন না। 

ডান্ডিগঞ্জে হিদুরাই ফ্যাক্ট : গত বছরের ২৩  অক্টোবর হিন্দুদের পাশে দাঁড়ান শামীম ওসমান। রংপুর পীরগঞ্জের বড় করিমপুর মাঝিপাড়া হিন্দুপল্লীর ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়ে অসামপ্রদায়িকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি। তার নেতৃত্বে জেলার শীর্ষ ব্যবসায়ী ও হিন্দু ধর্মীয় নেতারা জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এমপির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নগদ ৫০ লাখ টাকা অনুদান নেয়া হয়। ওই সময়ে প্রতিনিধি দলের সাথে থাকা নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল জানান, শামীম ওসমান ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ১০ লাখ এবং ব্যবসায়ীরা ৪০ লাখ টাকা দিয়েছেন। শুধু শামীম ওসমানই নয় সাবেক মেয়র ও সব দলই যুগ যুগ থেকে নারায়াণগঞ্জে হিন্দুদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখে। হিন্দুরাই বেলা শেষে বড় আকারের ভোট ব্যাঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। এ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আ.লীগের মেয়র প্রার্থী ও জেলা আ.লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘এই নারায়ণগঞ্জ সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির শহর। অনেক আগে থেকে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান আমরা এক সাথে বসবাস করছি। আমি সব সময় অসামপ্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। আমরা প্রায় সময় দেখি নারায়ণগঞ্জকে জঙ্গি খেতাব দেয়ার চেষ্টা চলে। কে করছে এগুলো? কারা করছে? তারা হলো এই আ.লীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা ব্যক্তি স্বার্থান্বেষী লোক। এমন নেতা আছে যার কোনো ব্যবসা নেই, অথচ তার কোটি কোটি টাকা আয়। এ শহরে তাদের জায়গার কোনো অভাব নেই, টাকা দিয়ে তারা সব কিছু করতে পারে। তাদের কাছ থেকে যেন আমরা সাবধান থাকি। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা যেকোনো সংঘাতে লিপ্ত হতে চাচ্ছে এবং সুপরিকল্পিতভাবে শহরকে অস্থির করতে চাচ্ছে। সে বিষয়ে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। 

শামীম ওসমান ইস্যুতে বিরক্ত আইভী : নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে এমপি শামীম ওসমান ও মেয়রপ্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলন করে তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন এবং  বলেছেন, তিনি নৌকার লোক, নৌকার পক্ষেই আছেন। কিন্তু ডা. সেলিনা  হায়াৎ আইভী বলেছেন, সে (শামীম ওসমান) তো নৌকার লোক, নৌকা ছাড়া যাবে কোথায়? গতকাল বুধবার সকালে ১৫ নং ওয়ার্ডে গণসংযোগকালে ‘শামীম ওসমান আপনার সঙ্গে আছেন কি না’— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আইভী এ কথা বলেন। তবে এ সময় আইভী বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, আপনারা এই লোকটার বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করেন কেন? আরও তো অনেক বিষয় আছে, সেগুলো বলেন। নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কায় আছেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১১ সালের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। ২০১৬ সালের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। এবারো নির্বাচনি পরিবেশ সুষ্ঠু রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আপনারা দেখেছেন ঋষিপাড়ায় আমরা তিনটা বিল্ডিং করছি ১০ তলা করে। অনেকেই তো জানেন, ঋষিপাড়া বস্তি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আট একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। আমি তো সেই বস্তি তুলে দেইনি। আমি ১৮ বছর যাবৎ আপনাদের শহরে। তা হলে আমার বিরুদ্ধে নির্বাচন এলেই যারা মিথ্যা কথা বলে তাদেরকে কখনো বরদাশত করবেন না। সবাই নৌকা মার্কায় ভোট দেবেন।

আইভী বলেন, আমার আসলে বলার কিছু নেই। আমি ১৮ বছর ধরে আপনাদের সাথে কথা বলছি। আমি কী কখনো মিথ্যা কথা বলেছি, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি— আমি কী দখলবাজি করেছি? সব ধর্মের জন্য সমানভাবে কাজ করেছি। এই যে আপনাদের কাছে এসে মিথ্যা কথা বলছে যে, এই র্যালি বাগান আমি তুলে দেবো, এটা কী সঠিক? আমার বাবা আপনাদের সাথে রাজনীতি করেছেন। আমার স্কুল জীবন এখানে কেটেছে। আমরা এখানেই থাকতাম। 

তৈমূরের প্রচারণায় আকরাম, নারায়ণগঞ্জবাসী পরিবর্তন চায় : নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি ও জেলা আ.লীগের সাবেক আহ্বায়ক এস এম আকরাম বলেছেন, নারায়ণগঞ্জবাসী পরিবর্তন চায়। গত ১৮ বছরে উন্নয়ন হয়েছে। তবে, তৈমূর আলম খন্দকার নির্বাচিত হলে এর চেয়ে আরও বেশি উন্নয়ন হবে। যেটা হবে না, সেটা হচ্ছে, সিন্ডিকেট বন্ধ হবে, দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে। তৈমূর আলম খন্দকার অত্যন্ত দক্ষ একজন নেতা, অত্যন্ত ত্যাগী একজন নেতা। আমি বিশ্বাস করি, নারায়ণগঞ্জবাসী মিলে এবার পরিবর্তন আনবে। গতকাল বুধবার সকালে নগরীর খানপুরে হাসপাতাল রোডে স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূরের নির্বাচনি প্রচারণায় তিনি এসব কথা বলেন।  তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যেমন পরিবর্তন দেখতে চাই, ঠিক একইভাবে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও আমরা পরিবর্তন দেখতে চাই। আপনাদের কাছে আন্তরিকভাবে অনুরোধ করছি, এই সুযোগ আপনারা হারাবেন না। ঘরে বসে থাকবেন না, সবাই ভোট দিতে যাবেন। হাতি মার্কায় ভোট দিয়ে তৈমূর আলম খন্দকারকে বিজয়ী করেই ঘরে ফিরবেন। প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন রেখে এস এম আকরাম বলেন, এই যে হয়রানিমূলক গ্রেপ্তার হচ্ছে, কি উদ্দেশে। এতদিন কি কারণে গ্রেপ্তার করলেন না? নির্বাচনে নেমেছে বলেই এই মুহূর্তে কেন গ্রেপ্তার করবেন। নির্বাচনটা নিরপেক্ষভাবে হতে দিন। তারপরে যার বিরুদ্ধে মামলা আছে, তাকে গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তার হোক, অপরাধী শাস্তির আওতায় আসুক এটা আমরাও চাই। অপরাধীদের রক্ষা করার জন্য তৈমূর আলম খন্দকার দাঁড়াননি। তিনি একজন আইনজীবী, দেশে আইনের পক্ষে কাজ করেন। আমরাও চাই দেশে আইনর শাসন প্রতিষ্ঠা হোক। এই হয়রানি বন্ধ করুন, এই হয়রানি করে আমাদের এই অগ্রযাত্রা বন্ধ করতে পারবেন না।