Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ১৮ মে, ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

শেষ মুহূর্তেও আ.লীগে অনৈক্য

রফিকুল ইসলাম

জানুয়ারি ১৪, ২০২২, ০৬:৩০ পিএম


সমাবেশ, র‌্যালি, গণমিছিল, শোডাউন ও ভোটারের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে গতকাল মধ্যরাতে শেষ হয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা। 

আগামীকাল রোববার উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে দিয়ে নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন স্থানীয় ভোটাররা। নগরপিতা নির্ধারণ করার আগে প্রার্থীদের যোগ্যতা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন তারা। ভোটের দিনক্ষণ যতই এগিয়ে আসছে ততই নির্বাচনি কৌশল পরিবর্তন করছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। 

তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হলেও শেষ মুহূর্তে চ্যালেঞ্জবিহীন নির্বাচন দেখছেন আইভী। শেষ মুহূর্তেও নৌকার পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে যে  ঐক্য হচ্ছে না, সে বিষয়ে বার্তা দিচ্ছেন।

আইভীর দাবি, ‘আমাকে পরাজিত করতে সব বিপক্ষ এক হয়ে গেছে। পক্ষটা ঘরের হতে পারে, বাইরেরও হতে পারে। তারা সব মিলে গেছে, কীভাবে আমাকে পরাজিত করা যায়। নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট গ্রহণের শঙ্কায় স্বস্তিতে নেই স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার। 

তার দাবি,  নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সরকারি দলের (আ.লীগ) মেহমানরা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন ঠুঁটো জগন্নাথ। 

নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, কেউ কেউ অশান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। নির্বাচনকে ঘিরে সন্ত্রাসীদের উঁকি-ঝুঁকি আমরা মানব না।

জানা যায়, গতকাল শুক্রবার মধ্যরাতে শেষ হয়েছে  নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা। প্রচারণার শেষ দিনে সাংগঠনিক শক্তির মহড়া দেখিয়েছে আওয়ামী লীগ। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারা যুবলীগ, ছাত্রলীগ, সেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতা ও সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে নিয়ে নির্বাচনি সমাবেশ, র্যালি, গণমিছিল ও শোডাউন করেছেন। 

ওই প্রচারণায় নৌকার পক্ষে ভোট চেয়েছেন তারা। বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে স্থানীয় ভোটারদের মাঝে তুলে ধরেছেন দলীয় প্রার্থীর ব্যক্তিগত অবস্থান, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তির অবস্থান। তুলে ধরা হয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে কোনো দ্বন্দ্ব, কোন্দল ও দূরত্ব নেই। 

গতকাল প্রচারের শেষ দিনে নারায়ণগঞ্জের ২ নম্বর রেলগেট এলাকায় নৌকার পক্ষে পথসভায় আওয়ামী লীগের প্রসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, ‘আগামী ১৬ তারিখ নির্বাচন। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে আজকের এ পথসভা। এখানে বলতে চাই, আইভী তিন তিনবার মেয়র ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই আইভীকে নিয়ে আমরা আপনাদের মাঝে এসেছি। 

আইভী হঠাৎ করে আপনাদের মাঝে আসেননি। অগ্নিপরীক্ষায় পরীক্ষিত এ সেলিনা হায়াৎ আইভী। এ নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন কে? সে আমাদের আইভী।’  

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, ‘এ নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নের জন্য আপনারা আইভীকে নির্বাচিত করুন। আইভী নির্বাচিত হলে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নের সব দায়িত্ব আমাদের নেত্রী নেবেন।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘মনে রাখবেন, কেউ কেউ অশান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। গতকাল আমরা বলেছি কোনো বিশৃঙ্খলা এ নারায়ণগঞ্জে হতে পারবে না। নির্বাচনকে ঘিরে সন্ত্রাসীদের উঁকি-ঝুঁকি আমরা মানব না।’  

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপেও শেষ মুহূর্তে ঐক্য হচ্ছে না নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের। দীর্ঘদিন ধরে যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল, তা শেষ পর্যন্ত সমাধান আর হচ্ছে না। এখনো বিভক্ত হয়ে আছে ওয়ার্ড পর্যায়ে আইভী বিরোধী নেতারা। মূলত যারা নির্বাচনের প্রচারণার প্রথম দিন থেকেই নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তারা এখনো নৌকার বিরুদ্ধে অনড়। আইভী বিরোধীরা শেষ পর্যন্ত আইভীকে ভোট দেবে কি-না তা নিয়ে তৈরি হওয়া শঙ্কা আরও বাড়ছে। নির্বাচনের এ পরিবেশ ভোট গ্রহণের সময় পর্যন্ত থাকলে আওয়ামী লীগের ভেতরে থাকা আইভী বিরোধীদের ভোট পাবেন স্বতস্ত্র প্রার্থী তৈমূর। কেন্দ্রীয় নেতাদের পদচারণায় জেলার শীর্ষ নেতাদের মধ্যে কিছুটা প্রভাব পড়লেও তৃণমূলের কর্মীদের ওপর প্রভাব পড়েনি একেবারেই। 

কেউ কেউ মনে করছেন, দলীয় কোন্দল নিরসন এবং নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা শুরু থেকেই রাখছেন। একাধিক নেতার সাথে বৈঠক করেছেন। সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। তাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। কিন্তু লোকাল নেতাদের যে ভূমিকা পালন করা দরকার, অনেকে তা করতে পারেননি। ফলে তৃণমূলের নেতারা এখনো বিমুখ। যদিও সব শঙ্কা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীই বিজয়ী হবেন বলে মনে করছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। তাদের মতে, দল মত ভেদাভেদ ভুলে নৌকার পক্ষে জোয়ার উঠেছে। 

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নৌকার মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, এখানে নির্বাচনটা হচ্ছে আইভী ভার্সেস অনেক কিছু। সহিংসতা ঘটাতে অনেক পক্ষই এক হতে পারে। আমার প্রতিটি নির্বাচনই চ্যালেঞ্জিং ছিল। বিগত কোনো নির্বাচনই চ্যালেঞ্জবিহীন ছিল না। এই নির্বাচনও চ্যালেঞ্জিং বিভিন্ন কারণে।’ 

তিনি বলেন, ‘আমাকে পরাজিত করতে সব বিপক্ষ এক হয়ে গেছে। এখন সেই পক্ষটা ঘরের হতে পারে, বাইরেরও হতে পারে। তারা সব মিলে গেছে, কীভাবে আমাকে পরাজিত করা যায়। কীভাবে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ভোটটাকে ঝামেলায় ফেলা যায়। কারণ সবাই জানে, আমার বিজয় সুনিশ্চিত।’ 

গতকাল সকালে নিজ বাসায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনকে আমি আগেই জানিয়েছি, যাতে ভোটকেন্দ্রে ভোটার যেতে পারেন। নারী ভোটার ও তরুণ ভোটাররা যেন যেতে পারেন। কারণ এ ভোটগুলো আমার। কোনো ধরনের সহিংসতা যেন না হয়। ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা না হলে আমার বিজয় সুনিশ্চিত। নির্বাচনে আমি জিতবই, ইনশাআল্লাহ।’ 

আইভী বলেন, ‘তবে আমার বিজয় সুনিশ্চিত জেনে কেউ যদি ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা করে সেটি মোটেও ঠিক হবে না। এ ক্ষেত্রে আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অনুরোধ করব তারা যেন বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখে।’ 

আইভী বলেন, ‘আমি সবসময় শান্তির পক্ষে। আমি মনে করি না যে, সে রকম কিছু (সহিংসতা) হবে আমার তরফ থেকে। আমার ওই ধরনের কোনো বাহিনী নেই। আমি কোনোদিন সহিংসতা করিনি।’

ভোটে সহিংসতা হলে নিজের ক্ষতির আশঙ্কা করে তিনি বলেন, ‘একটি পক্ষ সহিংসতা চাচ্ছে। আমার নির্বাচনি এলাকায় যেখানে সবচেয়ে বেশি জমজমাট, সেই জায়গাগুলোর মধ্যে হয়তো কেউ সহিংসতা করে ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দিতে পারে। আমি প্রশাসনকে বরাবরই বলে আসছি ভোটের দিন যেন উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে, আমার নারী ভোটাররা যেন আসতে পারে, নতুন প্রজন্মের ভোটাররা যেন আসতে পারে। কারণ আমি জানি এই ভোটগুলো আমার এবং আমি নির্বাচনে জিতব ইনশাআল্লাহ। সুতরাং আমার বিজয় সুনিশ্চিত যেনে কেউ যদি সহিংসতা করে, তাহলে এটা ঠিক হবে না।’ 

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের হোটেলগুলো চেক করলেই দেখবেন বিভিন্ন জেলার সরকার দলীয় নেতারা সেগুলোতে অবস্থান করছেন। সার্কিট হাউজ ও ডাক বাংলোকে নির্বাচনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। আইনানুযায়ী এ ক্ষেত্রে সরকারি কোনো গাড়ি বা কোনো ডাকবাংলো ব্যবহার করার নিয়ম নেই। এটা আচরণবিধির লঙ্ঘন। এভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেই আমাদের সরকারি দলের মেহমানরা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন।’  

গতকাল সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে যদি জনতার রায়ের মাধ্যমে আশার প্রতিফলন ঘটে এতে প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। নির্বাচন কমিশনকে আমরা অত্যন্ত আস্থার সাথে অনেকগুলো অভিযোগ করেছিলাম, সেগুলোর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং সে সব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এটা থেকে বোঝা যায়, নির্বাচন কমিশন ঠুঁটো জগন্নাথ।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক তার কিছু সঙ্গী নিয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি অবশ্য বলেছেন, তিনি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে যাননি। কিন্তু তার বক্তব্য ও দেখা করতে যাওয়ার সময়ের সাথে কোনো সমন্বয় নেই। প্রথমত তিনি নির্বাচনের আগে কোনোভাবেই প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। তিনি নারায়ণগঞ্জের নাগরিকও নন। এটা আইনগতভাবে আমি অন্যায় মনে করি। তিনি জনমনে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছেন। এমন একজন উচ্চ পর্যায়ের সম্মানিত নেতার কাছ থেকে আমরা এটা আশা করি না।’ 

তৈমূর বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জনগণ সন্দিহান হয়ে পড়েছে। আমি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, নারায়ণগঞ্জের মানুষ প্রত্যাশা করে আপনি এ দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক হয়ে নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনকে নির্বিঘ্ন, স্বচ্ছ এবং সুন্দরভাবে করার জন্য ব্যবস্থা নেবেন।’