লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ

এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোভিড রোগীর সংখ্যা প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউয়ে ফের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল প্রায় সাড়ে চার হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে। অথচ সপ্তাহের শুরুতে শনিবার শনাক্তের সংখ্যা ছিল এক হাজারের সামান্য বেশি। 

সাত দিনের ব্যবধানে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে রোগী। বিশ্বজুড়ে ফের করোনা সমংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য আফ্রিকায় শনাক্ত হওয়া নতুন ধরন ওমিক্রনকে দায়ী করা হচ্ছে। বাংলাদেশে জিম্বাবুয়ে ফেরত দুই নারী ক্রিকেটারের শরীরে গত মাসে প্রথম শনাক্ত হয়েছিল। 

ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশেও ওমিক্রনের গণসংক্রমণ হয়েছে। কারণ ইতোমধ্যে এমন অনেক ওমিক্রন আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে যাদের বিদেশ ভ্রমণের রেকর্ড নেই। তারা ওমিক্রন আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এসে সংক্রমিত হয়েছে। সেই হিসেবে দেশে ওমিক্রনের গণসংক্রমণ ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সরকারের কাছে ওমিক্রনের গণসংক্রমণ বিষয়ে তেমন তথ্য নেই। 

কারণ ভাইরাসটির গতিবিধি নির্ণয়ের জন্য জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের বড় পরিসরে কোনো উদ্যোগ এখনো গড়ে ওঠেনি। সরকারি-বেসরকারি মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠানে স্বল্প পরিসরে জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হচ্ছে। 

সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ফের করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য ওমিক্রন ভাইরাস দায়ী। এখন করোনা আক্রান্ত রোগীর প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত ওমিক্রন আক্রান্ত বলেও তিনি দাবি করেছেন। 

এদিকে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের তৃতীয় ঢেউয়ে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে সাড়ে ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে শনাক্তের হার। এখন জীবন ও জীবিকা এক সাথে পরিচালনা করতে হলে সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সেই সাথে সরকারকে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও উদ্যোগী হতে হবে। একই সাথে প্রতিটি নাগরিকের টিকার অধিকার দ্রুততার সাথে নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গতকাল শুক্রবার চার হাজার ৩৭৮ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ছয় জনের। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার তিন হাজার ৩৫৯ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। সেদিন ১২ জনের মৃত্যুর তথ্য দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তার আগের দিন বুধবার দুই হাজার ৯১৬ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। একই সময়ে চার জনের মৃত্যু হয়। 

এর আগের দিন ১১ জানুয়ারি দুই হাজার ৪৫৮ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হলেও মৃত্যু হয়েছে দুই জনের। তার আগের দিন ১০ জানুয়ারি দুই হাজার ২৩১ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। মারা যায় আরও তিনজন। ৯ জানুয়ারি এক হাজার ৪৯১ জনের নমুনায় ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। এ সময় মৃত্যু হয় আরও তিন জনের। তার আগের দিন এক হাজার ১১৬ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। মারা যায় একজন। গত এক সপ্তাহে দেশের ১৭ হাজার ৯৪৯ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। এ সময় মৃত্যু হয় ৩১ জনের। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গতকাল আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ভাইরাসটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২৮ হাজার ১২৯ জন। এ সময় করোনা শনাক্ত হয়েছে চার হাজার ৩৭৮ জনের দেহে। এ নিয়ে দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ১৬ লাখ ৯ হাজার ৪২ জন। 

গতকাল প্রাণ হারানো ছয় জনের মধ্যে দুই জন পুরুষ এবং চার জন নারী। তাদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে পাঁচ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা গেছে। এ পর্যন্ত মৃতের মধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার ৯৮৫ জন (৬৩ দশমিক ৯৪ ভাগ) ও নারী ১০ হাজার ১৪৪ জন (৩৬ দশমিক শূন্য ছয় ভাগ)। এ সময় সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতাল ও বাড়িতে সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা ৩৫১ জন। এ নিয়ে দেশে সুস্থ হয়েছে মোট ১৫ লাখ ৫২ হাজার ৩০৬ জন রোগী। 

গতকাল শনাক্তের হার ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এ পর্যন্ত শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৬৩ ভাগ। সুস্থতার হার ৯৬ দশমিক ৪৭ ভাগ এবং শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার এক দশমিক ৭৫ ভাগ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২০’-এর সর্বশেষ তথ্যমতে, পয়লা জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত দেশের মোট জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৯১  লাখ। তার মধ্যে মাত্র তিন কোটি ৪৫ লাখ ৫১ হাজার ৪০৮ জন নাগরিক দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত আট কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ১৩৯ জন করোনা টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে সাত কোটি ৯৮ লাখ ৮৩ হাজার ২৫৫ জন নিবন্ধন করেছেন। পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে ১২ লাখ ৪৯ হাজার ২৬ জন নিবন্ধন করেছেন এবং জন্ম সনদ নম্বর দিয়ে টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন আরও ছয় লাখ ৪৭ হাজার ৮৫৮ শিশু। নিবন্ধন শেষে টিকার অপেক্ষায় আছে আরও ৩৪ লাখ সাত হাজার ৫৩৮ জন। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইস বিভাগের তথ্য মতে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে ১৪ কোটি ১৯ লাখ ১৯ হাজার ৩৩০ ডোজ করোনার টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। তার মধ্যে প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন আট কোটি ৫১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৭ জন। দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিয়েছেন পাঁচ কোটি ৬১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯০ জন এবং বুস্টার (তৃতীয় ডোজ) ডোজ নিয়েছেন পাঁচ লাখ ৭২ হাজার ৮৬৩ জন। 

শিক্ষার্থীরা টিকা নিয়েছে এক কোটি আট লাখ ৭৮ হাজার ৮৯৮ ডোজ। গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে প্রান্তিক মানুষ টিকা নিয়েছে দুই কোটি ৭১ লাখ ৭৬ হাজার ৮০০ ডোজ। এর মধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কোভিশিল্ড প্রয়োগ করা হয়েছে দুই কোটি ৫১ লাখ ২১ হাজার ৮২৬ ডোজ। ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে এক কোটি ৫৩ লাখ ৩২ হাজার ১৪৮ ডোজ।

 চীনের সিনোফার্মের টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে ৯ কোটি ২৯ লাখ ৬৭ হাজার ১১১ ডোজ। মডার্নার টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে ৫৪ লাখ ১০ হাজার ১৪৮ ডোজ এবং সিনোভ্যাক টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ৯৭ ডোজ। দুই ডোজ টিকা নিয়েছে পাঁচ কোটি ৬১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯০ জন এবং বুস্টার ডোজ নিয়েছে পাঁচ লাখ ৭২ হাজার ৮৬৩ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি দেশে করোনার টিকাদান শুরু হয়। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি এখন পর্যন্ত গণটিকাদানের দুটি বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে গত ২৭ সেপ্টেম্বর সারা দেশে করোনার গণটিকাদানের বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। এ কর্মসূচিতে এক দিনে ৭৫ লাখ ডোজ টিকা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। ওইদিন সারা দেশে ৬৭ লাখ ৫৮ হাজার ৯২২ ডোজ টিকা দেয়া হয়।

 এর আগে গত ৭ থেকে ১২ আগস্ট একটি বিশেষ সমপ্রসারিত কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছিল। তার প্রথম দিনেই ৩০ লাখের বেশি টিকা দেয়া হয়েছিল। ওই কর্মসূচির প্রথম দিনে গ্রাম, শহর, প্রায় সবখানেই মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা ডা. মো. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ভয় নয় সচেতনতা ও সতর্কতা পারে করোনার আসন্ন ঢেউ রুখতে। সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতেই জারি করা হয়েছে আংশিক বিধিনিষেধ। মানুষ যেন সতর্ক হয়। সার্বিক বিধিনিষেধ যেন জারি করতে না হয়। 

এরপরও যদি মানুষ সচেতন ও সতর্ক না হয় তাহলে সরকারের একার পক্ষে বিধিনিষেধ কিংবা জারিকৃত নির্দেশনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ জন্য সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। বাস্তবায়নেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। নয়তো সরকার রেস্টুরেন্টে টিকা কার্ড নিয়ে খেতে যাওয়ার কথা বলেছে কিন্তু রেস্টুরেন্ট মালিক যদি সেটি কার্যকর না করে সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। 

তিনি বলেন, সার্বিক ও কঠোর বিধিনিষেধ এড়িয়ে জীবন জীবিকা নিশ্চিত করতে হলে সরকারের সাথে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক জনপ্রতিনিধিকে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে। সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিজ নিজ এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করতে হবে।