প্রিন্ট সংস্করণ॥রায়হান আহমেদ তপাদার
ডিসেম্বর ৩, ২০১৮, ০৬:৩৯ পিএম
পৃথিবীব্যাপী খ্যাত আব্রাহাম লিঙ্কনের চিরায়ত সেই সংজ্ঞা ‘ডেমোক্র্যাসি অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল’- জনগণকেই এই তন্ত্রের মালিক-মোক্তার বলা হয়েছে। নির্বাচন যেহেতু সম্মতির স্মারক, সুতরাং গণতন্ত্রের কার্যকারিতার জন্য এটি একটি অনিবার্য বিষয়। নির্বাচন একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া যা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকতা দান করে। নির্বাচন একটি জবাব দিহিতার প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছে তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেয়। গণতন্ত্রকে কার্যকর, অর্থবহ ও ধারণযোগ্য করার জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তরে নিয়মিত নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। উন্নয়নশীল দেশের যেখানে যেখানে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকতা পরিলক্ষিত হয়, সেসব দেশে নিয়মিত নির্বাচন হয়ে আসছে। যেমন-ভারত ও মালয়েশিয়া। তবে নির্বাচনটি হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য। স্বৈরাচার নিয়ন্ত্রিত দেশগুলোতে যে গণতন্ত্রের মহড়া প্রদর্শিত হয় তা কখনোই সত্যিকার নির্বাচন নয়, গণতন্ত্রও নয়। বিশ্বে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে তাই দেখা যায়, প্রধানত দুটি কারণে রাজনৈতিক পরিম-ল সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে। নতুন গণতন্ত্র ফলে যৌক্তিক পরিণতি অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রথম, দেশে আইনের প্রাধান্যের পরিবর্তে ব্যক্তি প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এই প্রাধান্য বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত হয়ে দেশব্যাপী তার অশুভ প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। ফলে যার যা প্রাপ্য আইনসঙ্গতভাবে, সে পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং যার যা প্রাপ্য নয়, তা তার নিয়ন্ত্রণে আসে। এর ফলে গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা এবং ঔদাসীন্যের ঘন আস্তরণে ঢাকা পড়ে। যুক্তির স্থান গ্রহণ করে পেশিশক্তি। ন্যায়নীতি ও বৈধতার প্রশ্ন গৌণ হয়ে ওঠে। বিবেক-বিবেচনার স্থান সংকীর্ণ হয়ে আসে। ১৯৭৪ সালে বিশ্বের পাঁচটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চারটি ছিল পরিণত, শক্তিশালী ও জনকল্যাণমুখী। বর্তমানে এমন পরিণত গণতন্ত্রের সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশের কম। অঞ্চলভেদেও গণতন্ত্রের এ বেহাল অবস্থা চোখে পড়ার মতো। পশ্চিম ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোয় গণতন্ত্রের বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি সুষম। গোটা লাতিন আমেরিকা এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে গণতন্ত্রের উপস্থিতি রয়েছে বটে, কিন্তু এদের অর্ধেকই হলো অপরিণত। কেন এমন হয়? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ল্যারি ডায়মন্ড লিখেছেন, এ জন্য দায়ী প্রধান কারণ হচ্ছে, দেশে আইনের শাসনের পরিবর্তে ব্যক্তিশাসনের প্রাধান্য এবং জবাবদিহিতার অন্ধকার গুহা থেকে বেরিয়ে আসা ব্যাপকভিত্তিক দুর্নীতি, চোরাচালান, সন্ত্রাস ক্ষমতার ব্যক্তিকরণ এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন। রাষ্ট্রে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিসত্ত্বার অধিকারী ও বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়া বৈষম্যের শান্তিপূর্ণ সমাধানের অভাব। অর্থনৈতিক সংকট অথবা অর্থনীতির স্থবিরতা যা সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সততা, দক্ষতা এবং পেশাদারিত্বের অভাবে। গণতন্ত্রায়নের তৃতীয় প্রবাহে সৃষ্ট নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অধিকাংশই ‘প্রশাসনের এ তিনটি সংকটের’ কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতি রাজনীতিকদের সীমাহীন দুর্বলতা, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের মাধ্যমে ব্যক্তিগত এবং দলীয় পর্যায়ে যা কিছু কাক্সিক্ষত তা অর্জন করার উদগ্র কামনা রাজনৈতিক পরিম-ল থেকে ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, গ্রহণযোগ্য-অগ্রহণযোগ্য পরিসরে যে মূল্যবোধ সমাজকে স্থিতিশীল রাখে তা রাজনৈতিক সমাজ থেকে নির্বাসিত করছে। উল্লেখ্য, মূল্যবোধের অবক্ষয়ে সৃষ্ট মরুভূমিতে তখন আর অবশিষ্ট থাকে না সুনীতি অথবা সুরুচির কোনো শ্যামলিমা। কণ্টকময় ক্যাকটাসে তখন চারদিক ভরে ওঠে। এ অবস্থায় গণতন্ত্রের যে ছোট ছোট চারা রোপিত হয়েছিল সেগুলো বিবর্ণ-শ্রীহীন হতে বাধ্য, হচ্ছেও তাই। সারাবিশ্বের নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা ভীত ও শঙ্কিত হই। অজানা শঙ্কায় দিন গুনি। এইতো মাত্র তিন দশক আগে বিশ্বময় গণতন্ত্রায়নের যে প্রবাহ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সৃজনশীলতার স্পর্শে চারদিকে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল, তার গতি আজ স্তিমিত কেন? এ গতি কি স্তব্ধ হয়ে পড়বে? গণতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থা কেন স্থবির হয়ে উঠছে? এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য এই লেখা নয়, বরং যারা এ সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তা করেন তাদের ভাবনাকে খানিকটা উসকে দেওয়াই এর লক্ষ্য। সত্যি বটে, যখন গত শতকের সপ্তম দশকের শুরুতে পর্তুগালের জনগণ দীর্ঘদিনের সযতেœ লালিত একনায়কত্বের দেয়ালগুলোকে একটার পর একটা গুঁড়িয়ে দিয়ে চারদিকে জমে থাকা অন্ধকার দূর করে গণতন্ত্রের আলোয় উদ্ভাসিত করে তোলে, সবার অজান্তে তখন এক বিপ্লবের জন্ম হয়। এ বিপ্লবই গণতন্ত্রের তৃতীয় ধারা রূপে বিশ্বময় পরিচিত। পর্তুগালের দেখাদেখি ইউরোপের স্পেন ও গ্রিসে, তারপর গোটা লাতিন আমেরিকায়, ১৯৮৯ সালে বার্লিনের দেয়াল ধসে পড়লে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে, এমনকি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবং আফ্রিকায় গণতন্ত্রের জয়যাত্রা নতুনভাবে সবাইকে সম্মোহিত করে তোলে। এর পরও সামরিক শাসকদের উপদ্রব থেমে থাকেনি। জাতিসংঘের এক রিপোর্টে দেখা যায়, ১৯৯৫ সালে বিশ্বে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা ছিল ১১৭টি। ২০০২ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১২১টি। ২০০৩ সালে আবারও তা নেমে আসে ১১৭তে। তারপর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার তেমন বিপর্যয় এখনো ঘটেনি বটে, তবে নতুন গণতন্ত্রগুলোর বেশ কয়েকটি এমনভাবে অসুস্থ যে, যে কোনো সময় একনায়কত্বের কবলে পড়ে যেতে পারে-এমন আশঙ্কা অনেক পর্যালোচকের। ২০০৫ সালে নেপালে রাজতন্ত্রের রাজমুকুট ঝলমলিয়ে উঠেছিল বটে, কিন্তু সংগ্রামী জনতার সতর্ক প্রহরায় আবার তা ম্লান হয়ে পড়েছে। সামরিক কর্মকর্তা হুগো শ্যাভেজের রোমশ হাতের প্রচন্ড চাপ থেকে ভেনিজুয়েলা এখনো মুক্তির পথ খুঁজছে। বৃহৎ দেশগুলোর মধ্যে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া গণতন্ত্র, না আধা গণতন্ত্র-এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন উত্থাপন করে চলেছেন। আর্মেনিয়া, ইউক্রেন, প্যারাগুয়ে, নাইজেরিয়া ও মোজাম্বিকের মতো রাষ্ট্রে বিদ্যমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচিত কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে মাত্র তিনটি বাল্টিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের শ্রী বৃদ্ধি ঘটেছে। অন্য ১২টি ক্রমান্বয়ে রুগ্ন হয়ে পড়ছে। দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার ২৫টি রাষ্ট্রের অর্ধেকটির অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। বর্তমানে আফ্রিকার প্রত্যেক পাঁচটি রাষ্ট্রের দুটিই গণতান্ত্রিক, তবে সবই অপরিণত। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ১৯টি রাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র দুটি গণতান্ত্রিক। অন্যগুলোয় চলছে রাজতন্ত্রের রাজসিক সৌকর্য এবং একনায়কদের আস্ফালন। যে ৫৭টি রাষ্ট্রের সমন্বয়ে ইসলামি সম্মেলন সংস্থা গঠিত তাদের মাত্র নয়টি গণতন্ত্রের আশীর্বাদপুষ্ট, কিন্তু নয়টির মধ্যে মাত্র দুটি রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিণত। মোট কথা, ২০০৩ সালের হিসাব অনুযায়ী ১১৭ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যে ৪৪টিই অপরিণত, রুগ্ন ও নির্বাচিত কর্তৃত্ববাদী। আমাদের দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশও এই ৪৪টির একটি। এসব রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের কাঠামো তৈরি হয়েছে। বিদ্যমান রয়েছে একাধিক রাজনৈতিক দল। আইনসভা সংগঠিত হয়েছে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে। আইনসভাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কার্যকর, অন্তত আকারে ও আদলে। এদের রয়েছে সুলিখিত সংবিধানও। তত্ত্বগত দিক থেকে জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংগঠিত মন্ত্রিসভা আইনসভার কাছে দায়ীও বটে। অন্য কথায়, এসব রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের কাঠামো নির্মিত হয়ে গেছে। যা হয়নি তা হলো গণতন্ত্রকে কার্যকর করার দায়িত্ব যাদের, তাদের গণতান্ত্রিক মন এখনো গড়ে ওঠেনি। দৈহিক গঠন সম্পূর্ণ, কিন্তু যে মন এবং হৃদয় দেহকে সচল রাখে তার জন্ম এখনো হয়নি এসব দেশে। অথচ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন দুইয়েরই। কাঠামোর এবং চালিকাশক্তি গণতান্ত্রিক মনের। দেহ ব্যতীত মন যেমন বাস্তবতাবির্জিত, কাল্পনিক, হৃদয়হীন দেহ তেমনি ভয়ঙ্কর, পাশবিক ও অকল্যাণকর। রাষ্ট্রদেহের সমন্বিত কর্মসম্পন্নের জন্য তাই প্রয়োজন সুষম কাঠামো এবং কাঠামোগুলোকে সুচারুরূপে দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে পরিচালিত করার উপযোগী মানসিকতা। নতুন গণতান্ত্রিক সমাজগুলোয় এই দুইয়ের সমন্বয় এখনো ঘটেনি। ঘটেনি বলেই এসব ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। এসব দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ঠিকই এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্বাচন হয় সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ। কিন্তু হলে কী হবে, এসব দেশের রাজনীতির কুশীলবরা নির্বাচনে শুধু বিজয়ী হতে শিখেছেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণ মানেই তাদের দৃষ্টিতে বিজয়ী হওয়া। কিন্তু নির্বাচনে যে বিজয়ের সঙ্গে পরাজয়ও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তা তাদের ধারণায় নেই। তারা পরাজয় মানতে শেখেননি। বিজয়ী হলে তাই তারা উল্লাসে মেতে ওঠেন। গণতন্ত্রে যেহেতু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকার শুধু বিজয়ীদের, বিজয়ী হয়ে তারা এই ক্ষমতাকে কীভাবে স্থায়ী করা যায়, কীভাবে নিজেদের প্রভাব-বৈভব বৃদ্ধির লক্ষ্যে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে কীভাবে পদে পদে দলিত-মথিত করা যায়-এসব ভাবনায় উদ্বেল হয়ে ওঠেন। আর পরাজিত হলে তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। যেহেতু পরাজয়কে বিজয়ের মতো উদারভাবে গ্রহণ করতে তারা শেখেননি, তাই হাজারো ষড়যন্ত্র আবিষ্কারে তারা মেতে ওঠেন। কারচুপি, তা সূক্ষ্ম হোক আর স্থূল, ভোটচুরি-ভোট ডাকাতি, তা সাধারণ হোক আর ঐতিহাসিক, ব্লুপ্রিন্টের নির্বাচন প্রভৃতি অভিযোগের ফুলঝুরি ছুটিয়ে সমাজব্যাপী এক ধরনের অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করেন। যারা বিজয়ী হলেন তারাও তাদের বিজয়কে উদারভাবে গ্রহণ করে জনগণের বিজয় বলে চিহ্নিত করতে শেখেননি। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সোনার হরিণটি একবার যখন হাতের মুঠোয় এসে পড়েছে, তখন এর পুরোপুরি সদ্ব্যবহারে আত্মনিয়োগ করেন। জনগণের বিজয় বলে চিহ্নিত করলে সেই ক্ষমতাকে জনকল্যাণের সহস্র খাতে প্রয়োগ ঘটিয়ে সমাজের বঞ্চিত ও অবহেলিতদের জীবনমান উন্নয়নের হাজারো ধারায় প্রবাহিত করে, জাতীয় পর্যায়ে অগ্রগতির প্রবাহকে আর বেগবতি করে, আকাশটাকে ছোঁয়ার কোনো আগ্রহ তাদের নেই। প্রতিপক্ষকে শত্রুরূপে চিহ্নিত করে ঘায়েল করার অভিযানে লিপ্ত হন। ফলে রাজনীতি হয়ে ওঠে সংঘাতময়। যে রাজনীতির জন্ম হয়েছে সমস্যা সমাধানের জন্য, তা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে গোটা রাজনৈতিক পরিম-লকে সমস্যাসংকুল করে তোলেন।
লেখক ও কলামিস্ট