লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড এবং ৪১ যাত্রীর অপমৃত্যুর বিচার বিভাগীয় তদন্ত

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে গেলো তা দেখে স্তম্বিত হয়ে গেছি। অশ্রুসিক্ত হয়েছে দুচোখ। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে হয়তো ছুটে যেতেন ঘটনাস্থলে প্রাণ ভরে কাঁদতেন, কাঁদতো সারা জাতি, শোকে মুহ্যমান হতো সবাই।

"অশ্রু মানুষের প্রকৃতির জন্য চরম প্রাসঙ্গিক," ভিনগারহোটস ওকল্যান্ডারকে বলেছিলেন, "আমরা কাঁদি কারণ আমাদের অন্য লোকেদের প্রয়োজন।"

বাংলাদেশের ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সরকারের ক্রমবর্ধমান দায়বদ্ধতার একটি  চিত্র ফুটে উঠছে গণমাধ্যমে। অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে, কমবেশি ১৫০ মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন অন্তত ৭০ জন নারী-পুরুষ ও শিশু যাত্রী। বাংলাদেশে লঞ্চডুবির ঘটনা প্রায়ই ঘটে আসছে বিশেষতঃ ঈদ ও আনন্দ উৎসব আয়োজনের সময়ে কিন্তু চলন্ত লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের মতো এত বড় ঘটনা এবং এর ভয়াবহতা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। দেশের নদীপথে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার আরেকটি পরিণতি সংযোজিত হলো এ ঘটনার মাধ্যমে। ৮ জুলাই ২০০৩ সালে ঢাকা থেকে ভোলার লালমোহনগামী এমভি নাসরিন-১ নামের একটি লঞ্চ চাঁদপুরের মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় ডুবে প্রায় সাড়ে ছয়শ’ যাত্রী মারা যায় এবং মরদেহ উদ্ধার হয়। 

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা কোস্ট বিডির এক গবেষণায় দেখা যায় যে গত ২০ বছরে (২০২০ সাল পর্যন্ত) দেশের নৌপথে ১২টি বড় রকমের দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ শতের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। লঞ্চ মালিক ও কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সব সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমুদ্র, নৌ ও স্থল বন্দরসমূহের আধুনিকায়ন, নৌ-পথের নাব্যতা সংরক্ষণ, মেরিটাইম সেক্টরে দক্ষ জনবল সৃষ্টি, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এবং বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়তাকরনের অভিলক্ষ্য কাজ করছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় মন্ত্রণালয়। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে নৌপথের যোগাযোগ, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারকরণ, নাব্যতা বৃদ্ধি, নৌ-বন্দরসমূহের ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, সমন্বিত ড্রেজিং কার্যক্রম, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের উন্নয়ন, স্থল বন্দর উন্নয়ন, সমুদ্র পথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দক্ষ নাবিক তৈরীর দায়িত্বে নিয়োজিত এ মন্ত্রণালয়ের অধীন ১২ সংস্থা।

অগ্নিকাণ্ডের এ ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর কিছু  দায়বদ্ধতার কথা গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার মতো অমানবিক এ আচরণ শুধু লঞ্চ মালিকদের নয় বরং তাদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা গুলোকে নিতে হবে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ৭ সদস্যের এবং বিআইডব্লিউটিএ ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দেশের নদীপথে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার মূল কারণ অনুসন্ধান এবং এর সাথে সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি স্বতন্ত্র বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন প্রয়োজন। অগ্নিকাণ্ডের কারণ খতিয়ে দেখতে  তদন্ত কমিটি দুটির অনুসন্ধানমূলক তথ্য কাজে আসতে পারে তবে তদন্তের বিশ্বাস যোগ্যতা ও কার্যকারিতার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো দেশের নদ-নদী। বাংলাদেশের গৌরব হল এটি বিশ্বের বৃহত্তম জল নেটওয়ার্কগুলির একটি। এর নদী গুলো, শাখা নদী সহ মোট ৭০০ টি নদী রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪,১৪০ কিলোমিটার। স্বাধীনোত্তর রেল, নৌ ও সড়ক  পরিবহন খাতের সমন্বয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সৃষ্টি  যা পরবর্তী সময়ে কার্যপরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় জাতীয় স্বার্থে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে পুনর্বিন্যাস করে বন্দর, জাহাজ চলাচল ও অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারি মাসে বন্দর, জাহাজ চলাচল ও অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়কে ‘নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়’ হিসেবে নামকরণ করা হয়।

বাংলাদেশ দেশের নদীগুলোর সাংবিধানিক ট্রাস্টি সরকার। বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় পানি সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা এবং এর আওতাধীন দপ্তরসমূহের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এর সকল প্রকার নীতি, পরিকল্পনা, কর্মকৌশল, নির্দেশমালা এবং আইন, বিধি-বিধান, রেগুলেশন ইত্যাদি তৈরি ও বাস্তবায়ন করে।

দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর নৌ-পরিবহন বিষয়ক জুনিয়র মন্ত্রী খালেদ মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “রেকর্ড থেকে জানা যায় যে ৩১০ জন তালিকাভুক্ত যাত্রী ফেরিতে ভ্রমণ করেছিলেন, তবে আমরা ধরে নিচ্ছি প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি।”

বিভিন্ন সংবাদ সূত্রে প্রকাশ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে সুগন্ধা নদীতে প্রায় ৮০০ যাত্রী বহন করছিলো জনাকীর্ণ তিনতলা এ  ফেরিটি। এতে আগুন ধরে গেলে  কমপক্ষে ৪১ জন নিহত এবং ১৫০ জনের বেশি আহত হয়, কর্মকর্তারা বলেছেন, সাম্প্রতিকতম সামুদ্রিক ট্র্যাজেডিতে নদী দ্বারা বিপর্যস্ত দেশ।

“অধিকাংশ লোক আগুনে পুড়ে মারা গেছে বা গরম ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট জনিত কারণে মারা গেছে। অনেক যাত্রী নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাঁতার কাটতে পারেননি বা উদ্ধার করতে পারেননি,” ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের আরেক কর্মকর্তা এর আগে বলেছিলেন যে আগুন লাগার সময় অনেক যাত্রী ঘুমিয়ে ছিলেন, কেউ ধোঁয়া শ্বাস নিতে গিয়ে মারা যান, কেউ কেউ পুড়ে মারা যান এবং কেউ ডুবে মারা যান।

"দুর্ঘটনার পর লঞ্চটি সম্পর্কে যেসব তথ্য বেরিয়ে এল, তা খুবই উদ্বেগজনক। লঞ্চটির ইঞ্জিন বদল করা হয়েছিল কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে; ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন করা হয়েছিল, ইঞ্জিনে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটি পাড়ে না ভিড়িয়ে চালক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। লঞ্চে যে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা ছিল, তা-ও অপ্রতুল। ছবিতে দেখা যায়, পুরো লঞ্চটিই পুড়ে গেছে, কঙ্কালের মতো কাঠামো কোনোভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটি কূলে ভেড়ানো সম্ভব হলে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি অনেক কম হতো, (প্রথম আলো, ডিসেম্বর ২৫, ২০২১)

কথিত দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে অবহেলা, রয়েছে অপ্রস্তুতি, রয়েছে আগুন নেভানোর সরঞ্জাম এর অভাব, রয়েছে প্রশিক্ষিত স্টাফের অভাব, রয়েছে অবৈধ যন্ত্র সংযোগও পুনঃস্থাপন, রয়েছে অতিরিক্ত যাত্রী বহন সহ অনেক অভিযোগ যার কারণে এতগুলো মানুষের জীবন্ত দগ্ধ হওয়া। এমন একটি মর্মন্তুদ ঘটনায় বস্তুনিষ্ট তদন্ত হওয়া উচিত। উচিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত, উচিত মহামন্য হাইকোর্টের একটি স্বপ্রনোদিত রুল যেন প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের সম্মুখীন করতে বাধ্য হয় সরকার।  সেই সঙ্গে নিহত যাত্রীর পরিবারেরা আদালতের মাধ্যমে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পান।

আমারসংবাদ/কেএস