Amar Sangbad
ঢাকা রবিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯

অধিকার আদায় এবং নারী নেতৃত্ব

জান্নাতুল ফেরদৌস

জানুয়ারি ১, ২০২২, ০৭:৩৫ পিএম


অধিকার আদায় এবং নারী নেতৃত্ব

বাংলাদেশে নারী ও মেয়ে শিশুর ওপর নির্যাতন, হত্যা এবং সহিংসতা বেড়েই যাচ্ছে। এসব যারা করছে, তাদের দুঃসাহস এতটাই বেড়েছে যে, অন্যায় করে সামাজিক মাধ্যমে তা পোস্ট করছে এবং নিজেরাই আজেবাজে মন্তব্য করছে। 

এরকম ঘটনা একটার পর একটা ঘটেই চলেছে। কিন্তু ঘটনাগুলোর কোনো সুরাহা হচ্ছে না। অপরাধীকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসাও বেশ দুরূহ হয়ে যাচ্ছে। আবার বিচারের মুখোমুখি হলেও বিভিন্ন ফাঁক গলে অপরাধী ছাড় পেয়ে যায়। ফলে অপরাধীদের পরিমাণ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। 

অপরাধীরা আস্কারা পাচ্ছে, অন্যদিকে বিচারের দাবি ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা সাধারণ মানুষকে ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন করে তুললেও যেসকল নারীবাদীরা ঘটনাপ্রবাহের প্রতিকারে শক্ত ভূমিকা রাখার কথা তারা সেখানে আশানুরূপ ভূমিকা রাখতে পারেন না।

জাতিসংঘের মহিলা দপ্তর ইউএন ওম্যান ২০২১ সালের শুরুতে নারী অধিকার আদায়ে একটি অ্যাকশান প্ল্যান হাতে নিয়েছে। এই কর্মসূচির নাম দেয়া হয়েছে ১০০ দিনের অ্যাকশান প্ল্যান। কয়েকটি বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা দেখানোর চেষ্টা করা হয়। 

এর মধ্যে দঢ় প্রত্যয়, সম্মিলিত উদ্যোগ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাকে প্রধান কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বরাবরের মতো এসব উদ্যোগ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কতটুকু যুক্তিযুক্ত। কিংবা আদৌও আমরা এসব কর্মসূচির আওতায় সফলতা অর্জন করতে পারছি কি-না সে বিষয়ে কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না বরং বিষয়গুলো অধিক ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই কৈশোরে সন্তান জন্মদানের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১০ জন মেয়ের মধ্যে একজন ১৫ বছর বয়সের আগেই সন্তানের জন্ম দেয়। আর প্রতি তিনজনের একজন কিশোরী ১৯ বছর বয়সের মধ্যে সন্তান জন্ম দেয় অথবা গর্ভধারণ করে। ৫১ শতাংশ নারীর বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছর বয়সের আগেই।

১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকার নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য দূরীকরণে জাতিসংঘ ঘোষিত সিডও সনদে স্বাক্ষর করে। দেশে শিশু নীতিমালা ২০১১, চিলড্রেন অ্যাক্ট-২০১৩ এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান ১১তম সংসদে এযাবৎকালের সর্বোচ্চসংখ্যক (২৩ জন) নারী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। নারীর অংশগ্রহণ ২০০০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ৩৬ দশমিক তিন শতাংশে উন্নীত হয়েছে। পরিবর্তনের ধারায় ভূমিকা রাখতে যুবরাও এগিয়ে আসছে।

নেতৃত্ব তৈরি হলে নারীর পক্ষে সোচ্চার হওয়ার জায়গা তৈরি হবে। এ কথা সহজ সরল। তবে কখনও কখনও নারী নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অপর নারীর ওপর নির্যাতন চালিয়ে থাকে। এমনকি নিজের পরিবারের সদস্যদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা প্রবল। ২০২০ সালে কোভিডে বিশ্বজুড়েই নারীর প্রতি সহিংসতা অনেক বেড়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে প্রতিদিন পৃথিবীতে গড়ে ১৩৭ জন নারী তার পরিবারের সদস্যদের কারণে মৃত্যুবরণ করছেন।

নারীর ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বকে নির্যাতন বলে মানতে নারাজ অনেকেই। পরিবারের কাজ কঠিন কিছু নয়, গৃহিণীদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়— ও বাসায় থাকে, কিছু করে না। সবাই জানে, কোভিডের সময় নারীর কাজের চাপ বেড়েছে। ২০১৪ সালে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও সিপিডির যুগ্ম গবেষণা বলছে, স্বাভাবিক সময়ে নারী ও পুরুষের অবৈতনিক কাজের অনুপাত ছিলো ১২: ২.৭। কোভিডের সময়ে এই ব্যবধানও অনেক বেড়েছে। এসবের বাইরে মহামারির সময়টিতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসা, নিরাপত্তা— সব ক্ষেত্রেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারীরা।

আশার কথা হচ্ছে, কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুর্দান্ত নেতৃত্ব দিয়েছে নারীরা। সামনের সারির লড়াই থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণ- সব ক্ষেত্রেই ছিলো নারীর দৃপ্ত পদচারণা। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, চিকিৎসকদের ৬২ শতাংশ পুরুষ আর ৩৮ শতাংশ নারী। নার্সদের মধ্যে ছয় শতাংশ পুরুষ ও ৯৪ শতাংশ নারী। বলা বাহুল্য, কোভিড বিস্তার রোধে এবং অসুস্থদের সেবা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের উন্নয়নকর্মীদের একটা বিশাল অংশও নারী, কোভিড-১৯ ঠেকাতে এরা সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সেবা দিয়ে গেছেন। 

তবে প্রতিনিয়ত পত্রিকার কাগজে খবর আসে এ স্থানে বাসে নারী ধর্ষণ। সে স্থানে নারীকে অপহরণ। এসব ঘটনাপ্রবাহ বিরল নয়। প্রতিনিয়ত আপনার আমার চোখের সামনে ভাসে। এসব নিয়ন্ত্রণে আমাদের পদক্ষেপ কী? স্পষ্ট হয় যে, আমাদের পরিবহন, আমাদের গণপরিবহন নিরাপদ নয়, এর সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষগুলোকে আমরা নিরাপদ মনে করি না। কাজেই আমাদের বাস-ট্রাক-গাড়ির ড্রাইভার, হেলপার, কন্ডাক্টরদের একটা নেটওয়ার্কের মধ্যে আনুন। 

কে কোথায় কখন কোন ডিউটিতে আছেন, সেটা যেন আমাদের জানা থাকে। তাদের প্রশিক্ষণ দিন। আমরা জানি, আমাদের প্রায় ২৬ লাখ গাড়ি আছে, কিন্তু লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক এর অর্ধেক। আর যারা লাইসেন্স পেয়েছেন, তাদের বেশির ভাগেরই প্রশিক্ষণ নেই। লাইসেন্স পাওয়ার পরীক্ষা নিলে তারা ফেল করবেন। আর তাদের যে প্রশিক্ষণ হবে, তা কেবল গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নয়; প্রশিক্ষণ হবে মূল্যবোধের। 

তাদের উপলব্ধি করতে পারতে হবে যে প্রতিটা মানুষের জীবন মূল্যবান। সামান্য ভুলেই এক বা একাধিক মানুষের জীবনহানি ঘটতে পারে। বোঝাতে হবে, নারী এবং পুরুষ সমান; এবং নারীকে বিশেষভাবে সম্মান করতে হয়। এটা ঘরে, এটা বাইরে। সম্মান করতে হয় নিজের স্ত্রীকে, মাকে, বোনকে, ভাবিকে, বান্ধবীকে, প্রেমিকাকে, সন্তানকে, দাদি-নানি-খালাকে, ছাত্রীকে, শিক্ষিকাকে, পরিচিতাকে, অপরিচিতাকে।

এই শেষের শিক্ষাটা কেবল চালক, সহকারী, কন্ডাক্টরদের লাগবে তা নয়; আমাদের সবার লাগবে। সব পুরুষের লাগবে, সব নারীর লাগবে।
বাংলাদেশের প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সরকারি চাকরিতে নারীদের অবস্থান সংহত হচ্ছে। নারীরা তৃণমূলে যেমন কাজ করছেন, তেমনি রয়েছেন শীর্ষ পদে। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়- নারীরা কতটুকু সুযোগ পাচ্ছেন?

বাংলাদেশে এখন ১৪৯টি উপজেলায় নির্বাহী অফিসার পদে কর্মরত আছেন নারী। আর উপজেলা হলো বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সরকারের যেকেনো ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় এই পর্যায় থেকে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সরাসরি সাধারণ মানুষের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করতে হয়। তাদের সামাল দিতে হয় স্থানীয় নানা সমস্যা থেকে শুরু করে উন্নয়নমূলক কাজ। এই করোনার সময় লকডাউন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা থেকে শুরু করে উপজেলার প্রধান নির্বাহী হিসেবে তাদের সবকিছুই দেখতে হয়।

এদিকে প্রত্যন্ত পর্যায়ে নারীদের অধিকার আদায়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য দলগুলোর কমিটিতে যে সংখ্যায় নারী সদস্য রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা এখনো পূরণ করতে পারেনি কোনো দলই। ফলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলে নারীদের জায়গা করে নেয়া কতটা সহজ? বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে?

পাশাপাশি নারীদের অনেক সমস্যা, এর মধ্যে আর্থিক সমস্যা প্রধান, আর রাজনৈতিক দলে অবস্থান তৈরি করা বা রাজনৈতিকভাবে একটা জায়গায় পৌঁছানো নারীদের জন্য একেবারে সহজ কাজ নয়। আবার কঠোর পরিশ্রমী কোনো নারী সদস্য কাজ করলে কমবেশি মূল্যায়ন হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলো সেটা দিচ্ছে বলেই সর্বজন মত দিয়ে থাকেন। কিন্তু মাঠপর্যায় থেকে রাজনীতি করে নারীরা কি একটি দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারেন? সে সুযোগ কি আছে? তবুও নারীদের অধিকার কতটা আদায় হয়, কিংবা উঁচু তলার নারীদের তুলনায় গ্রামীণ অঞ্চলের নারীরা অধিকার সম্পর্কে কতটুকু সাধীনতা ভোগ করতে পারেন। আদৌও সাধীনতা বলতে সেই অল্প শিক্ষিত আধা শিক্ষিত নারীরা কিছু কি বোঝেন? নাকি বুঝতে চাইলে খবরদারির জোরে সেটি ছিটকে পড়ে অতল গভীরে। 

এসব প্রশ্নগুলো আমাদের সভা সমাবেশে কিংবা গুণীজনদের বক্তব্যে সচরাচর উঠে আসে না। তবে সময় এসেছে জাগ্রত হওয়ার। নারীদের অধিকার আদায়ে সবার প্রথমে তাদের সোচ্চার হতে হবে। নেতৃত্ব গঠনের মাধ্যমে প্রতিটি নারীর কথা একজনকে বলতে হবে। সহানুভূতি দেখানোর পাশাপাশি অসহায় নারীর জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবেই প্রকৃত নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা সহজতর হবে।

লেখক : ড. জান্নাতুল ফেরদৌস, সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়