Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ২৫ মে, ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

ইতিহাসের পাতায় প্যান্ডোরা পিথস! 

শিবু দাশ সুমিত

জানুয়ারি ২২, ২০২২, ১২:১৫ পিএম


ইতিহাসের পাতায় প্যান্ডোরা পিথস! 

“A source of extensive but unforeseen troubles/problems or Liberty, Fraternity, Equality.” গ্রিক পুরাণ মতে দেবরাজ জিউস, হেফেথাসকে দিয়ে যে মাটির তৈরী নারী অবয়ব বানান তিনিই হলেন  প্যান্ডোরা। তখনো অবশ্য মানবজাতির সৃষ্টি হয়নি। মূলত টাইটান নামক দৈত্য ও গ্রিক দেবতারাই ছিলেন পৃথিবীর হর্তাকর্তা! মাঝে মধ্যেই তাদের যুদ্ধ হতো। যুদ্ধে গ্রিক দেবতারা জয়লাভ করলে টাইটানদের নিক্ষেপ করা হয় "টারটারাস" নামক নরকে। টাইটানদের মধ্যে ছিলেন প্রমিথিউস এবং এপিমেথিয়াস নামে দুই ভাই। প্রমিথিউস ছিলেন প্রচণ্ড দূরদর্শী। তিনি পূর্বেই বুঝতে পেরেছিলেন যুদ্ধে দেবতাদের জয় হবে, তাই তিনি দেবতাদের পক্ষ হয়ে লড়েছিলেন।পরবর্তীতে পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজন হলে এই দুই ভাইয়ের হাতে তা তুলে দেন দেবরাজ জিউস। বিভিন্ন প্রাণী সৃষ্টির দায়িত্ব গেলো এপিমেথিয়াসের হাতে। দেবরাজ জিউস তাঁকে কিছু উপকরণও দেন প্রাণী সৃষ্টি করতে। এপিমেথিয়াস যখন কোন কিছু চিন্তা ভাবনা না করেই একের পর এক পশু-পাখি সৃষ্টি করে যাচ্ছিলেন তখনপ্রমিথিউস বেশ সময় নিয়েই অনেক দরদ আর যত্ন দিয়ে শুধুমাত্র একদলা মাটি থেকে সুন্দর অবয়বের মানুষ তৈরি করছিলেন। 

মিথ আছে মানুষ তৈরি করার পর প্রমিথিউস দেখেন তাঁর ভাই এপিমেথিয়াস জিউসের দেয়া সব উপকরণ পশু পাখির জন্য শেষ করে ফেলেছেন। যেখানে অন্যান্য পশুপাখি শক্তিমত্তা, শক্ত খোলস, মসৃণ গরম পালক, শক্ত নখ, দ্রুততা, ক্ষিপ্রতাসহ অনেক কিছুই পেয়েছে, সেখানে মানুষ ছিলো নগ্ন, অসহায়, অনিরাপদ ও দুর্বলতায় পরিপূর্ণ। দেবরাজ জিউস চাইতেন মানুষ হবে অসহায়, সে সবসময় অলিম্পাস পর্বতে থাকা দেবতাদের উপাসনা করবে,অসহায় থাকবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে এবং সেসব থেকে মানুষকে পরিত্রাণ পেতে হলে দেবতাদের উপাসনা করতে হবে। অন্যদিকে প্রমিথিউস চাইতেন তাঁর সৃষ্ট মানুষ হবে আরো মহান। অবশ্য মানুষের কল্যাণার্থে এরই মধ্যে প্রমিথিউস দেবরাজ জিউসকে বেশ বড়সড় ধোঁকা দিয়ে ফেলেছেন। দেবরাজ জিউস জানালেন মানুষ ব্যতীত অন্য যেকোন একটি প্রাণীকে দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে হবে এবং উৎসর্গের পর যা অবশিষ্ট থাকবে সেটি হবে মানুষের পুরস্কার। প্রমিথিউস সিদ্ধান্ত নিলেন এই খেলায় জয়ী করবেন মানুষকে। তিনি একটি গোরুকে হত্যা করে মাংস ও চামড়া রাখলেন এক পাত্রে যার উপর দিলেন নাড়িভুঁড়ি। অন্য পাত্রে রাখলেন হাড় ও অন্যান্য অংশ যার উপর চর্বি দিয়ে আবৃত করে রাখলেন। প্রমিথিউস দেবরাজ জিউসকে বললেন যেকোন একটি পাত্র বেছে নিতে। জিউস চর্বি দ্বারা আবৃত পাত্রটি বেছে নিলেন এবং ধোঁকা খেলেন। এই প্রতারণার জন্যই মূলত তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে মানুষ যাতে পৃথিবীতে আগুন ব্যবহার করে রান্না করতে না পারে, সেজন্য তিনি পৃথিবীতে আগুনের ব্যবহার বন্ধ করে দিলেন। পরে অবশ্য প্রমিথিউস অলিম্পাস পাহাড়ের চূড়া থেকে ঠিকই মানুষের জন্য আগুন চুরি করে এনেছিলেন। এই আগুন পাবার পর থেকেই সভ্যতার পথে বিচরণ শুরু মানবজাতির।আগুনের কাছ থেকেই মানুষ পেল নিরাপত্তা, উষ্ণতা, কিভাবে পশুর মতো জীবন যাপন না করে বাড়িতে বাস করা যায়, ঝড়ে কিংবা কোন বিপদে কিভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয়। 

দেবরাজ জিউস সবকিছু প্রত্যক্ষ করে প্রমিথিউসকে এক কঠিন শাস্তি দিলেন। প্রমিথিউসকে এক পর্বতের চূড়ায় অনন্তকালের জন্য শৃংখলিত করে রাখা হলো। সকালবেলা সেখানে প্রতিদিন একটি শকুন আসতো যে কিনা সারাদিন প্রমিথিউসের কলিজা ঠুকরে ঠুকরে খেতো। রাতে আবার নতুন কলিজা প্রতিস্থাপন করা হতো তাঁর শরীরে এবং পরেরদিন শকুনটি আবার তা ভক্ষণ করতো৷ নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করলেও প্রমিথিউস তাঁর কৃতকর্মের জন্য কখনো ক্ষমা বা অনুশোচনা করেননি। এস্কাইলসের “প্রমিথিউস বাউন্ড” থেকে শেলির ” প্রমিথিউস আনবাউন্ড ” হয়ে মেরি শেলির “ফ্রাঙ্কেনস্টাইন “- যুগ যুগ ধরে ফিরে এসেছে প্রমিথিউস নামক মহান মানুষটি। দেবরাজ জিউস আরো তীব্র যন্ত্রণা মানুষের মাঝে দেবার পণ করেছিলেন। হেফেথাসকে দিয়ে দেবরাজ জিউস যে প্যান্ডোরা নামক নারী সৃষ্টি করলেন তাতে প্রত্যেক দেবতাই তাঁকে এমন সব গুণাবলি দান করলেন যাতে প্যান্ডোরা হয়ে উঠলেন অনন্য। প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি দিলেন সৌন্দর্য-লাবণ্য-আকাংখা, হার্মিস দিলেন দৃঢ়তা আর চাতুর্য, আরো দিলেন মিষ্টি কণ্ঠস্বর, এথেনা তাঁকে রুপালী গাউনে আবৃত করলেন, সর্বশেষ দেবরাজ জিউসের স্ত্রী হেরা দিলেন তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্য তীব্র কৌতূহল। এটিই মূলত মানুষের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। উপহারস্বরুপ প্যান্ডোরাকে পাঠানো হয় এপিমেথিয়াসের কাছে। অবশ্য ভাই প্রমিথিউসের বারণ শুনেননি এপিমেথিয়াস। 

এপিমেথিয়াস ও প্যান্ডোরার বিয়েতে দেবরাজ জিউস প্যান্ডোরাকে এক অপূর্ব বক্স উপহার দেন যেটি তিনি খুলতে বারণ করে দেন। কিন্তু ওই যে, দেবী হেরা কর্তৃক প্যান্ডোরাকে দেয়া হয়েছিলো তীব্র কৌতূহল! নিষিদ্ধ বক্সের প্রতি প্যান্ডোরার আকর্ষণ দিন দিন তীব্র হচ্ছে। তাঁর কেবলই মনে হতে লাগলোবক্সে নিশ্চয় অমূল্য কিছু আছে যা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। প্যান্ডোরা ভাবলো শুধু একটু করে বক্সটি খুলে তা আবার চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেবে। অবশেষে বক্সের ঢাকনা হালকা করে খুললেন প্যান্ডোরা। এরই মধ্যে শোঁ শোঁ শব্দ করে বক্স থেকে সমস্ত রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা, জরা, ব্যাধি, দুর্ভিক্ষ, লোভ, লালসা, কামনা, বাসনা, প্লেগ, হিংসা, বিদ্বেষ বের হয়ে গেলো। এসব আগে কখনো পৃথিবীর কেউ দেখেনি। জারের ঢাকনাটি প্যান্ডোরা দ্রুত বন্ধ করে দেবার ফলে অবশ্য একটি জিনিসই জারে আটকা পড়ে রইলো! সম্ভবত সেটি "আশা" নামক শব্দটি। এসব নিয়েই পৃথিবীর মানুষকে অনাদি কাল থেকেই জীবন যাপন করতে হচ্ছে, হয়তো দিয়ে যেতে হবে একের পর এক কঠিন পরীক্ষা। 

লেখক: সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, নড়াইল।

আমার সংবাদ/আরএইচ