Amar Sangbad
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬,

বহিষ্কার হতে যাচ্ছে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা চেয়ারম্যান জাকির

এপ্রিল ৮, ২০১৬, ০৬:৩২ এএম


বহিষ্কার হতে যাচ্ছে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা চেয়ারম্যান জাকির

গত ২০১৪ সালে বিএনপির দলীয় সমর্থনে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন শিল্পপতি ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার। কুষ্টিয়ার রাজনীতির অনেকটা নতুন মুখ জাকির সরকার ঢাকায় নিজের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা সামলাতে ব্যস্ত থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে সে বসন্তের কোকিলের মত। সম্প্রতি সদরের একটি ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। তৃণমূল ও সদর উপজেলার নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্তকে তিনি বাকা পথে প্রতারণার মাধ্যমে পরিবর্তন করেছেন।

এ বিষয়টি গতকাল বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে জানাজানির পর ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। দলের সিনিয়র নেতারা তাকে ডেকে ভৎর্সনা করেছেন। জানা গেছে, কিছু দিনের মধ্যেই দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হতে পারে।

জাকির হোসেন সরকার কুষ্টিয়া সদরের রাজনীতিতে ফায়দা লুটার জন্য নানা মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি দলীয় সমর্থনে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েও কুষ্টিয়া সদর উপজেলাবাসীর জন্য তেমন কিছু করেন নি। নিজের পদ পদবী ঠিক রাখতে এবং ভবিষ্যতে আরো বড় জায়গায় যেতে তিনি বিএনপির সুবিধাবাদী কিছু নেতা ও কর্মীকে সুবিধা দিয়ে পক্ষে রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি কুষ্টিয়া সদর থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েও নিজেকে সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক পরিচয় দেন। দলের পদবীর সাথে এ প্রতারণার প্রমাণও রয়েছে পত্রিকায় প্রকাশিত বিবৃতির মাধ্যমে।

কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারের আগমন ঘঠেছে সদূর প্রসারি ষড়যন্ত্র ও খারাপ উদ্দ্যেশে। বিভিন্ন সময়ে শুধুমাত্র কুষ্টিয়া সদর আসনকে অস্থিতিশীল করতে বাইরে থেকে ভাড়া করে লোক এনে এখানে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এর আগে মিরপুরের রেজাউল করিম খান কুষ্টিয়া সদরে এসে দৌঁড়ঝাপ শুরু করে। সে কিছুদিন পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে সরে যায়। পরে বীরবিক্রমে আগমন ঘটে আলী আসকর কোরেশি তালালের। ভেড়ামারার এই সু-পুত্র তালাল কোরেশি লাঠিসোটা নিয়ে কুষ্টিয়া সদর দখলের জন্য লাখ লাখ টাকা ছিটাতে থাকে। তিনি বিনামূল্যে কর্মিদের মোটরসাইকেল এবং ক্যাডারদের লাঠি সরবরাহ করে। কিছুদিন হৈ চৈ করার পর জায়গার জিনিস আবার জায়গায় ফিরে গেছে। ঢাকা থেকে আসা তালাল কোরেশি আবার নিরবে নিভৃতে ঢাকায় ডাক্তারি করছেন। তিনি এখন কুষ্টিয়ার মানুষের কাছে অচেনা।

এবার দৃশ্যপটে এসেছেন জাকির হোসেন সরকার। ১৯৬৯ সালে ১৬ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার জিয়ারখী ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের মাতুলালয়ে জন্মগ্রহন করেন। তার বাবার বাড়ি দৌলতপুর উপজেলায়। তিনি বুয়েটে পড়াশোনা শেষে ঢাকায় চাকরি এবং বর্তমানে নিজেই সরকার স্টিল লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি পরিচালনা করেন। যতটুকু জানা গেছে, তিনি বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক হোসেন ফালুর বিলট্রেড কোম্পানিতে চাকুরি শুরু করেন। মেধাবী ও চতুর এই লোকটি এক সময় বিনাপূজিতে সে কোম্পানির পার্টনার বনে যান। ১/১১ এর পরে ফালুসহ সবাই গা ঢাকা দিলে জাকির সরকার নিজেই কে কোম্পানির বড় অংশ দখলে নেন। পরে তিনি সেখান থেকে সরে এসে সরকার স্টিল মিলস লিমিটেড নামে নিজের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান করেন। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া জাকির সরকার নিজের মেধা ও চাতুরি কাজে লাগিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল অর্থের মালিক বনে যান। এক পর্যায়ে সম্মান অর্জনের জন্য তার নেতা হওয়ার খায়েস জন্মায়। এবার তিনি কুষ্টিয়ার কাসিম বাজার কুঠি নামে পরিচিত এক হাউজের পরামর্শে কুষ্টিয়া সদরে ভর করেছেন।

বিগত দিনের মীর রেজাউল করিম ও তালাল কোরেশীর ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জাকির সরকার এখানে ভিন্ন পথ অবলম্বন করেন। তিনি সময় নিয়ে এবং ধৈর্য্যের সঙ্গে সুঁই হয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা বিএনপিতে প্রবেশ করে। দলে নতুন মুখ হিসাবে এসেই তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ঢাকা এবং দেশের বাইরে ব্যবসা বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করতে পারেননি। ফলে উপজেলা প্রশাসনে এক ধরণের স্থবিরতা বিরাজ করছে। কিন্তু এখানেও তিনি বাকা পথে দলের নানা ফায়দা লুটার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ঠান্ডা মাথার তরুণ এই জাকির সরকার সদর উপজেলার নেতাকর্মিদের পক্ষে রাখার জন্য তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। দলের জন্য পরীক্ষিত ও নিবেদিত নেতাকর্মিরা তার কাছে না ভিড়লেও ঘাপটি মেরে থাকা কিছু অসাধু কর্মি চারপাশে ঘুরঘুর শুরু করে। তাদের মাধ্যমে তিনি দলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সত্য সব সময়ই শক্তিশালী। তার এ চক্রান্ত এবার ফাঁস হয়ে গেছে। নড়েচড়ে বসেছে কুষ্টিয়া সদর থানা বিএনপির নেতাকর্মিরা। কুষ্টিয়ার মাটি ও মানুষের সাথে নাড়ির সম্পর্ক না থাকা এ জাকির হোসেন সরকারকে তারা কিছুতেই এখানকার ভবিষ্যতের নেতা হিসাবে মানতে পারছে না।

ইউনিয়ন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের জন্য দলীয়ভাবে কেন্দ্র থেকে একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে প্রত্যেক ইউনিয়নের সভাপতি, সেক্রেটারি ও সাংগঠণিক সম্পাদক এবং সদর থানা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং নবম সংসদে নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলীয় প্রার্থীর সুপারিশ থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোন জায়গায় বিতর্ক থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে সদর থানার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সে প্রার্থীকে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ পাঠাবে বলে কেন্দ্র থেকে সুষ্পষ্ট বলা হয়েছে। ইউনিয়ন নির্বাচনের প্রার্থী নির্বাচনে উপজেলা চেয়ারম্যানের কোন ভূমিকা বা মতামত নেওয়া কথা কোথাও বলা হয়নি। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ইউনিয়নগুলোর প্রার্থী ও ইউনিয়ন বিএনপির নেতাকর্মিদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সংক্ষিপ্ত রেজুলেশনসহ সবার তালিকা তৈরি করে মনোনয়নপত্র প্রেরণের জন্য কেন্দ্রে মহাসচিব বরাবর পাঠানো হয় গত ৫ এপ্রিল।

ব্যস্ততার কারণে সদর থানার সভাপতি, নবম সংসদের প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন নিজে না গিয়ে লিখিত দায়িত্ব দিয়ে এক নেতাকে সেখানে পাঠান। কেন্দ্রে এ মনোনয়ন জমা হওয়ার পর বিএনপির চেয়ারপার্সনের অফিস থেকে গোপনে জাকির সরকারের নিকট প্রার্থীদের তথ্য জানিয়ে দেওয়া হয়। ঐ অফিসের কম্পিউটার অপারেটর জনৈক জসিমের সঙ্গে জাকির সরকারের বিশেষ খাতির রয়েছে। হরিনারায়নপুর ইউনিয়নে তার পছন্দের প্রার্থীর নাম তালিকায় না থাকায় তিনি সেখানে ছুটে যান। সন্ধ্যার পর তিনি তৃণমূল ও থানা থেকে মনোনিত প্রার্থীর নামের জায়গায় পছন্দের প্রার্থীর নাম বসিয়ে সেখানে উপস্থিত থেকে মনোনয়নের চিঠি তৈরি করেন। তার পছন্দের প্রার্থীর ফরমে সদর থানা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কোন সুপারিশ নেই। তিনি গোপনে আসল প্রার্থীর কাগজপত্র সরিয়ে সেখানে নিজেরটা ঢুকিয়ে দেন। অন্যসবগুলো ঠিক থাকলেও শুধু একটি ইউনিয়নের মনোনয়ন পাল্টে যায়। এ ঘটনা জানাজানির পর রাতেই দলের শীর্ষনেতারা বিষয়টি অবগত হয়।

পরের দিন গত ৬ এপ্রিল জাকির সরকারের পছন্দের প্রার্থীকে বাদ দিয়ে থানা বিএনপির মনোনিত প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার সকল পক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু এ ঘটনা জানার পর জাকির সরকার আবারও ছুটে যান পার্টি অফিসে। সেখানে নানাভাবে দেনদরবার ও ধরাধরি করে ফাইলটি আটকে রাখেন। সন্ধ্যার পর দলের মহাসচিব সরাসরি অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিনের পাঠানো বাহক সদর থানা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এস আর শিপন বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে আশ্বস্ত করেন, রাতে ফিরে এসে তিনি সংশোধন করবেন। তাকে একটু অপেক্ষা করতে বলা হয়। এর মধ্যে জাকির সরকার নানাভাবে ছুটাছুটি করতে থাকে। এক পর্যায়ে রাত সাড়ে নয়টার দিকে মহাসচিব ফিরে এসে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে জররুর আলোচনায় বসেন। পরে নিজের রুমে বসলেও সেখানে ফাইলটি আর পাঠানো হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, জাকির সরকার পার্টি অফিসের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেনীর কিছু কর্মচারিকে সুবিধা দিয়ে সম্পূর্ণ অনিয়ম করে এ কাজটি করেছেন। বিষয়টি নিয়ে কুষ্টিয়া থেকে কেন্দ্রীয় শীর্ষনেতাদের সঙ্গে গতকালও কথা হয়েছে। লিখিত আবেদন পেলে এ অপরাধের কারণে জাকির সরকারকে দল থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে বলে তারা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে গতকাল কুষ্টিয়া সদর থানা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এস এম ওমর ফারুক জানান, দলের একজন নেতা বা কর্মি হিসাবে আমাদের সবারই উচিৎ দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া। নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিৎ। কেন্দ্র থেকে ঠিক ঘটেছে তা জানি না, তবে তৃণমূল ও সদর থানার সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে হরিনারায়নপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসাবে অন্য ব্যক্তির নাম আসায় আমরা মর্মাহত হয়েছি। এ ঘটনা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ করে থাকলে আমাদের কিছু বলার নেই। কিন্তু জাকির সরকারের কোন সম্পৃক্ততা থাকলে এ বিষয়ে অবশ্যই তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এ বিষয়ে জাকির হোসেন সরকারের সঙ্গে কথা বলার জন্য বার বার তার মোবাইলে চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি।