সকল সমস্যার সমাধানে ইস্তেগফার

আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার জন্য এমন একটি পথ নির্দেশক দিয়েছেন, যাতে একজন মানুষের জন্মের পূর্ব থেকে পূনরায় কবরস্থ পরবর্তী জীবনের সুউচ্চ সফলতার নির্দেশনা পরিপূর্ণরূপে লিখে দিয়েছেন।

তাঁর পক্ষ থেকে দূত পাঠিয়ে ঐসকল বাণীর বিস্তারিত ব্যাখ্যা মানুষকে সহজেই শিখার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর এটাই হলো পবিত্র আল কুরআন। যার মধ্যে রয়েছে মানুষের জীবনের সকল প্রয়োজন ও চাহিদা মিটানোর বহু পদ্ধতি। আর তারই অন্যতম একটি হলো- ইস্তেগফার তথা ক্ষমাপ্রার্থনা করা।

ইস্তেগফার সম্পর্কে আমরা যদি স্রেফ কুরআনুল কারীমে লক্ষ করি,তাহলে পরিলক্ষিত হয়, ১। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘তোমরা ইস্তেগফার করো আল্লাহর কাছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু’। (সুরা বাকারা: ১৯৯)।

পবিত্র কুরআনের উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ আমাদরেকে ইস্তেগফার তথা ক্ষমাপ্রার্থনা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা সুরা আলে ইমরানে বলেন, ‘আর তারা যখন কোন অশ্লীল কাজ করে ফেলে বা নিজের নফসের উপর (আল্লাহর হুকুম অমান্য করতঃ) কোন জুলুম করে ফেলে, তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তাদের কৃত গুনাহের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে অথচ আল্লাহই ক্ষমা করেন’। (সুরা আলে ইমরান:১৩৫)।

উক্ত আয়াতে আল্লাহ মুমীনের বৈশিষ্ট্যরুপে ইস্তেগফারকে তুলে ধরেছেন।

কুরআনের অন্যত্রে আল্লাহ বলেন, ‘আর কোন ব্যক্তি যখন মন্দ কাজ করে বা নিজের উপর জুলুম করে ফেলে অতঃপর আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার তথা ক্ষমাপ্রার্থনা করে আল্লাহকে (তখন)ক্ষমাশীল দয়ালুরূপেই পাবে’। (সুরা নিসা: ১১০)।
এই আয়াতে মহান আল্লাহ বুঝিয়েছেন মানুষের কৃত গুনাহের উপর ক্ষমাপ্রার্থনার জন্য কোন স্থান-কাল নির্দিষ্ট নয়, বরং সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমার জন্য প্রস্তুত থাকেন। তবে সেটা চাইতে হবে ইস্তেগফারের মাধ্যমে।

এমনিভাবে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের অন্যত্রে ঘোষণা করেন, ‘তোমার কেন আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করোনা? আশাবাদী তোমাদের উপর রহম করা হবে’। (সুরা নামল: ৪৬)।

দয়াময় আল্লাহ আমাদরকে এ আয়াতে রহম তথা দয়া করার ওয়াদা দিলেন ইস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনার শর্তে।

উক্ত আয়াতের শুরুর অংশে বলা হয়েছে, কেন তোমরা কল্যাণের উপর অকল্যাণকে অগ্রাধিকারগন্য করো!?

এতে প্রতীয়মান হয় যে, মানুষ চাইলেই একমাত্র ইস্তেগফারের মাধ্যমে কল্যাণকে তরান্বিত করতে সক্ষম।

ইস্তেগফার হলো এমন আমল যা আমাদেরকে সর্বপ্রকার আজাব-গজব থেকেও হিফাজত করে যেমনটি আল্লাহ বলেন, আর আল্লাহ এটাও চাননা যে,তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করতে থাকবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দিবেন’।(সূরা আনফাল৩৩)

আর কুরআনের সুরা আযযারিয়াতে ১৮নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘রাতের শেষ প্রহরে তাঁরা ক্ষমাপ্রার্থনা করে তথা ইবাদত করে। এবং সুরা ইউসুফের ৯৮নং আয়াতে হজরত ইয়াকুব আলাইহিসসালাম বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য আমার প্রভূর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করবো’।অধিকাংশ মুফাসসীরগণ বলেন, এক্ষমাপ্রার্থনা ছিলো রাতের শেষ প্রহরে।
তাই আল্লাহ পাক রাতের শেষ প্রহরে যারা ইস্তেগফার করে তাদের প্রশংসা করেছেন।

এমনিভাবে সুরা নূহ এর ক্রমান্বয়ে ১০,১১,১২নং আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা কতগুলো প্রয়োজন মিটিয়ে দেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি বলেন আমি বললাম তোমরা তোমাদের প্রভূর কাছে ইস্তেগফার করো!
নিশ্চয়ই তিনি অধিক ক্ষমাশীল’।(সুরা নূহ: ১০)।

‘তিনি আসমান থেকে তোমাদের জন্য রহমতের বারিধারা বর্ষণ করবেন’। (সুরা নূহ: ১১)। ‘এবং তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আর তোমাদের জন্য প্রতিস্থাপন করবেন উদ্যান (জান্নাত) ও প্রবাহিত করবেন নদীনালা’। (সুরা নূহ: ১২)।

উক্ত আয়াত সমূহে আল্লাহ একজন মানুষের প্রায় মৌলিক সকল প্রয়োজন মিটানোরই কথা দিলেন ইস্তেগফার তথা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে। চাওয়া লাগবে প্রভূর নিকটে।

ইস্তেগফার নিশ্চয়ই শারীরিক শক্তিও বৃদ্ধি করে। যেমন কুরআনে বর্ণিত হয়েছে হযরত হুদ আলাইহিসালামের উম্মতের শারীরিক শক্তির উপর কৃত অহংকারের বিপরীতে তিনি বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রভূর কাছে ইস্তেগফার (কৃত গুনাহের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা) করো, অতঃপর তার দিকে ফিরে আসো। তিনি তোমাদের জন্য আসমান থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটাবেন এবং তোমাদের শক্তিকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিবেন আর তোমরা পাপে লিপ্ত হওয়ার জন্য মুখ ঘুরিয়ে নিওনা’। (সুরা হুদ: ৫২)।

ঠিক তেমনিভাবে ইস্তেগফার তথা ক্ষমাপ্রার্থনা করা এটা শুধু সাধারণ মানুষের জন্যই ফজিলতের বিষয় নয়, বরং প্রায় সকল নবীদেরও সুন্নাত বা বৈশিষ্ট্য ছিলো। যেমন- হযরত আদম আলাইহিসসালাম তাঁর কৃত ভুলের জন্য ইস্তেগফার করেছিলেন এ মর্মে যে, ‘হে আমাদের প্রভূ! আমাদের নফসের উপর জুলুম হয়েগেছে, আপনি যদি ক্ষমা ও দয়া না করেন তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো’।(সুরা আরাফ: ২৩)।

তাছাড়া হযরত নূহ আলাইহিসসালাম ও এ মর্মে ইস্তেগফার করেছিলেন যে, ‘হে প্রভূ! আমাকে ক্ষমা করুন, এবং আমার মা-বাবাকে ক্ষমা করুন। আর মুমিন অবস্থায় যে আমার ঘরে প্রবেশ করে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিনা নারীদেরকে। আর অত্যাচারীদের জন্য শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি করো’। (সুরা নূহ: ২৮)।

তেমনি হযরত মূসা আলাইহিসসালাম যখন এক ব্যক্তিকে ঘুষি মেরেছিলেন, ঘটনাক্রমে ঐলোক মরে যায়। পরক্ষণেই হযরত মূসা আলাইহিসসালাম তাঁর কৃত ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন এমভাবে যে, ‘হে রব! নিশ্চয় আমি আমার নিজের উপর জুলুম করে ফেলেছি। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। তখন আল্লাহ তাঁকে ক্ষনা করেলেন। তিনিতো পরম ক্ষমাশীল দয়ালু’। (সুরা ক্বাসাস: ১৬)।

উপরোল্লিখিত আলোচনা সম্পূর্ণ কুরআনের আলোকে করা হয়েছে। এছাড়াও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসংখ্য হাদীসের মাধ্যমেও ইস্তেগফারের উপকারিতা তাৎপর্য বুঝে আসে।

এটাও জানা যায় যে, সকল নবীগণই স্বীয় উম্মতদেরকে ইস্তেগফারের তাগিদ দিয়েছেন। এবং যারাই গ্রহণ করেছে সফল হয়েছে।

সুতরাং, আমাদের জন্য আবশ্যক; আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটা প্রয়োজন-চাহিদা একমাত্র আমাদের প্রভূর কাছ থেকেই ইস্তেগফারের মাধ্যমে পূরণ করে নেয়া।

মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বেশি ইস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাউফীক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমীন।

আমারসংবাদ/আরএইচ