Amar Sangbad
ঢাকা শুক্রবার, ২০ মে, ২০২২, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

নাসিক নির্বাচন: রাত পোহালেই ভোট

নিজস্ব প্রতিবেদক

জানুয়ারি ১৫, ২০২২, ০৪:৪৫ পিএম


নাসিক নির্বাচন: রাত পোহালেই ভোট

টানা ১৮ দিনের প্রচার-প্রচারণার পর রবিবার (১৬ জানুয়ারি) তৃতীয়বারের মতো বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মোট সাতজন মেয়র প্রার্থী, ২৭ ওয়ার্ডে ১৪৮ জন সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী এবং সংরক্ষিত নারী আসনে ৩৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এর আগে শুক্রবার মধ্যরাতেই প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে।

নির্বাচনে সাতজন মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল  লড়াই হবে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী (নৌকা প্রতীক) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের (হাতি প্রতীক) মধ্যে।

গত দুই সিটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তার আগে ২০০৩ সালে বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।

২০১১ সালে প্রথম নাসিক নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী শামীম ওসমানকে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে দেশের প্রথম নারী মেয়র নির্বাচিত হন সেলিনা হায়াৎ আইভী। 

এরপর ২০১৬ সালে বিএনপির দলীয় প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের ব্যানারে দ্বিতীয় দফায় মেয়র নির্বাচিত হন আইভী। টানা ১০ বছর নগরমাতার দায়িত্ব পালন করে নারায়ণগঞ্জের সুশীল সমাজ এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের আস্থা অর্জন করেছেন তিনি।

এবারও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

অন্যদিকে, তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। ২০১১ সালে যাকে ভোট গ্রহণের কয়েক ঘণ্টা আগে বসিয়ে দেয় বিএনপি।

নিরাপত্তা জোরদার
শুক্রবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজা আক্তার জানান, নির্বাচনে ১৯২টি ভোটকেন্দ্র ও কেন্দ্রের বাইরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাঁচ হাজারের বেশি সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। প্রতিটি কেন্দ্রে থাকবেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২৬ জন করে সদস্য। এছাড়াও থাকবে পুলিশ ও র‌্যাবের স্ট্রাইকিং ফোর্স।

যেকোনো অপ্রীতিকর অবস্থা তৈরি হওয়ার আগেই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত থাকবেন।

এছাড়া, নাসিক নির্বাচন উপলক্ষে গত শুক্রবার মধ্যরাত থেকে আগামী সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত যানবাহন, নৌযান ও মোটর সাইকেল চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ’র স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনের কাজে যারা বাইরে থাকবে (পুলিশ-প্রশাসন, ডাক্তার, সংবাদকর্মীসহ অন্যান্য) তাদের ওপর এই আদেশ গণ্য করা হবে না। তবে তাদের প্রত্যেককে নিজের পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে।

নৌকা ভার্সেস এন্টি নৌকা
নগরবাসীর কাছে ব্যক্তি আইভী ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও তার প্রতীক প্রশ্নবিদ্ধ। তাই অনেকেই বলছেন, আইভীকে পছন্দ করলেও তাদের অনেকের ভোট নৌকায় পড়বে না।

তাছাড়া নির্বাচনটিকে কেউ কেউ আইভী ও তৈমূরের লড়াই হিসেবে দেখছে না। তারা দেখছেন নৌকা ভার্সেস এন্টি নৌকা লড়াই হিসেবে। তার মানে এবারের নির্বাচন হবে, আওয়ামী লীগ বনাম এন্টি আওয়ামী লীগ শক্তির মধ্যে।

এবারের নির্বাচনে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে প্রচারণা শেষ করেছেন আইভী। গত দুই নির্বাচনে তার প্রচারণার অগ্রভাগে যাদের দেখা গেছে, এবার তার প্রচারণায় তাদের কেউ ছিলেন না।

আচরণবিধি লঙ্ঘন হওয়ার আশঙ্কায় শামীম ওসমানও তার জন্য সরাসরি মাঠে নামতে পারেননি।

এদিকে, তৈমূর বিএনপির লোক হলেও তার মার্কা যেহেতু ধানের শীষ না, সেহেতু এন্টি আওয়ামী লীগের সকল ভোট তার হাতি মার্কার ঝুলিতে যাওয়াটাই স্বভাবিক।

তৈমূর আলম বিএনপি ঘরানার প্রার্থী হলেও তিনি নিজেকে জনতার প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করতে অনেকটা সক্ষম হয়েছেন। কারণ তার দল তাকে দুটি বড় পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। ফলে তিনি দাবি করেছেন, সব দলের ভোট তিনি পাবেন।

এছাড়া এস এম আকরামও তৈমূরের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। তিনি সরাসরি তৈমূর আলম খন্দকারের প্রচারণায় নেমেছেন। সদর-বন্দর আসনের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক আহ্বায়ক এস এম আকরামকে তৈমূরের প্রচারণায় দেখে উজ্জীবিত হয়েছে তৈমূর শিবির।

আকরামের বিষয়টিকে প্রচারণার শেষ সময়ে ভোটের মাঠে ‘চমক’ হিসেবে দেখছেন নগরবাসীও। কারণ ২০১১ সালে এস এম আকরাম সেলিনা হায়াৎ আইভীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ছিলেন। ওই সময়ে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে অবস্থান নেন তিনি। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আইভীর পক্ষে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামেন আকরাম এবং আইভী বিজয়ী হওয়ার একদিন পর ৩১ ডিসেম্বর নাটকীয়ভাবে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।

এছাড়াও, তৈমূরের পক্ষে নেমেছেন বন্দরের বিভিন্ন ইউনিয়নের জাতীয় পাটি সমর্থিত চেয়ারম্যানরা। ফলে তৈমুরের ভোটের পাল্লা ভারী হচ্ছে।

আইভী যদিও জোর দিয়ে বলেছেন, তার বিজয় নিশ্চিত। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও প্রচারণায় এসে ঘোষণা দিয়েছেন আইভী লক্ষাধিক ভোট বেশি পেয়ে জয়লাভ করবে।

তবে, শুক্রবার কিছুটা শঙ্কার কথা জানিয়েছেন আইভী। এদিন তার বাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নৌকাকে পরাজিত করতে দলের ভেতর ও বাইরের সব পক্ষ মিলে গেছে।

আইভীর সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান

মেয়র হিসেবে আইভী কতটা সফল? প্রচারণা শেষেও এই প্রশ্ন ঘুরছে নগরবাসীর মুখে মুখে। আইভীর সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। প্রচারণার শেষ সময়ে ভোটাররা হিসেবের খাতা খুলে বসেছেন।

নগরবাসীর মতে, গত ১০ বছরে নগরবাসীর চাওয়া ও প্রাপ্তির মধ্যে যথেষ্ট ফারাক রয়ে গেছে।

এছাড়াও রয়েছে ব্যক্তি আইভী না নৌকার আইভী, কোনটা বেশি জনপ্রিয়; এ নিয়েও চলছে আলোচনা।

নাগরিকেরা বলছেন, আইভীর দায়িত্ব পালনের দুই মেয়াদে দেওয়া বড় বড় প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন হয়নি।

এরমধ্যে ২০১১ সালে তার নির্বাচনী ইশতেহারের উল্লেখ্যযোগ্য প্রতিশ্রুতি ছিল- নারায়ণগঞ্জে একটি অত্যাধুনিক মেডিকেল কলেজ, পূর্ণাঙ্গ একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, শীতলক্ষ্যা নদীকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা, পুরো সিটি করপোরেশন এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসন, সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দরে আধুনিক পার্ক নির্মাণ; যা ২০২১ সাল পর্যন্তও আলোর মুখ দেখেনি।

২০১৬ সালে আইভীর নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে কার্বনমুক্ত, পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলা, নতুন বাস টার্মিনাল, ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণসহ সিটি সার্ভিস চালু, শীতলক্ষ্যা নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখার জন্য কার্যক্রম গ্রহণ; এগুলোরও কোনোটিরই বাস্তবায়ন হয়নি।

এছাড়া দীর্ঘ ১০ বছরেও চালু হয়নি সিটি সার্ভিস ও আধুনিক গণপরিবহন, এছাড়া শহরের নিত্যদিনের যানজট নিরসনে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। মাদক নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণে ছিল না কোন পদক্ষেপ। নগরীর সকল সড়কে স্থাপন হয়নি এলইডি লাইট।

২০১৬ সালের নির্বাচনে নিজের ইশতেহারে নগরের উন্নয়নে ২১টি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন আইভী।  এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ১৬টি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল পাঁচটি।  

যদিও এবারের নির্বাচনী প্রচারণার সময় আইভী দাবি করেছেন, ওই ইশতেহারের ৯০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করেছেন তিনি। মাত্র ১০ ভাগ কাজ বাকি।

তবে আইভীর প্রধান প্রতিপ্রতিদ্বন্দ্বি স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের অনুসারীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, বাস টার্মিনাল, ট্রাক টার্মিনাল, সিটি সার্ভিস, ঐতিহাসিক স্থানসমুহ সংরক্ষণ এবং শীতলক্ষ্যা দূষণমুক্ত করতে তেমন কোনো ভুমিকাই রাখেননি আইভী। ৯০ ভাগ ইশতেহার বাস্তবায়নের দাবিও ঠিক নয়।

নগরবাসীর মতে, রাস্তা-ঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করেছেন আইভী। কিন্তু বড় দুটি মেগা প্রজেক্টের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি তিনি। এগুলো হলো- নগরীর ১৬ নাম্বার ওয়ার্ডে শেখ রাসেল নগর পার্ক নির্মাণ এবং সিদ্ধিরগঞ্জ অংশে ডিএনডি খালকে লেকে রূপান্তরিত করে দুইপাড় বাধাই করে বিনোদন কেন্দ্রের উপযোগী করা।

এছাড়া, নগরীতে চলমান কিছু প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতাও নগরবাসীর বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলী আহাম্মদ চুনকা পাঠাগার ও মিলনায়তন নির্মাণ করতে গিয়ে এর সামনে থাকা ফুটপাত দখল করা হয়েছে মিলনায়তনের জন্য। তিন বছর ধরে ব্রিজ নির্মাণকাজ চললেও এখনো শেষ হয়নি। এতে করে ওই এলাকায় যানজট লেগেই থাকে। সেই সঙ্গে ধুলাবালির কারণে আশেপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও টেকা দায়।

অন্যদিকে, অতিরিক্ত করের বোঝা এই নগরীর বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতেও আহভী ব্যর্থ হয়েছেন। তবে এসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি নগরবাসীর মধ্যে আলোচিত তা হলো; করোনা মহামারির সময় সিটি করপোরেশন কোনো ভূমিকা না রাখা।

নিজের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্যাক্স বাড়ানোর ঘটনার কথা উল্লেখ করে তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, মোট ২২ শতাংশ ট্যাক্সের মধ্যে জমি ও ইমারতের ওপর সাত শতাংশ, সড়ক বাতির ওপর পাঁচ শতাংশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সাত শতাংশ এবং পানি সরবরাহের জন্য পাঁচ শতাংশ ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে। করোনা মহামারিতেও তিনি ট্যাক্স কমাননি, বরং বাড়িয়েছেন।

তবে এ অভিযোগের ব্যাপারে আইভী বরাবরই দাবি করেছেন, তিনি ট্যাক্স বাড়াননি। এটা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা।

আমারসংবাদ/এমএস