Amar Sangbad
ঢাকা সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪২৯

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস

জাহিদুল ইসলাম শিহাব॥প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৭, ০৫:৩৭ এএম


রোহিঙ্গাদের ইতিহাস

বিশ্বে সবচেয়ে আলোচনা ও সমলোচনার ঝড় তুলছে রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও রাখাইনদের নির্যাতন থেকে প্রাণে বাঁচার জন্য ছোট ছোট নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের দিকে আসতে থাকা স্রোতের মতো মানুষগুলোই রোহিঙ্গা। কিন্তু আসলেই রোহিঙ্গা কারা, কী তাদের পরিচয়? মিয়ানমারে তাদের সংকট কী? এই সংকট কি সাময়িক, নাকি বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের বড় কোনো ঝুঁকি? বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাহিনী জানা থাকলেও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের গল্প অনেকটাই অজানা আমাদের। নবম-দশম শতাব্দীতে আরাকান রাজ্য ‘রোহান’ কিংবা ‘রোহাঙ’ নামে পরিচিত ছিল, এই নামগুলো থেকেই সেই অঞ্চলের অধিবাসী ‘রোহিঙ্গা’ নামে পরিচিত। মিয়ানমার সরকার ‘রোহিঙ্গা’ বলে কোনো শব্দের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। রোহিঙ্গারা পূর্বতন বর্মা, অধুনা মিয়ানমারের পশ্চিম অঞ্চলের মুসলমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সংখ্যায় প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গার অধিকাংশ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পাশে উত্তর রাখাইন রাজ্য নামে নামকরণ করা পূর্ববর্তী আরাকান রাজ্যের তিনটি টাউনশিপে বাস করে।

১৪০৪ সালে বার্মার প্যাগান শাসকরা আরাকান দখল করে নিলে আরাকান রাজা মিন-স-মুন (মতান্তরে রাজা নারামেইখলা) পূর্বদিকে পালিয়ে বাংলায় চলে আসেন। বাংলার গৌড় সালতানাত তখন দিল্লির মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। মিন-স-মুন আশ্রয় নেওয়ার পরে দীর্ঘদিন গৌড় সুলতানের অধীনে রাজকর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। ১৪২৯ সালে সুলতান নাদির শাহ মিন-স-মুনকে তাঁর হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগী হন। সালতানাতের অস্ত্র ও সেনা সহায়তায় মিন-স-মুন পরের বছর তাঁর রাজ্য পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। এর ফলে ১৪৩০ থেকে ১৫৩১ সাল পর্যন্ত ১০০ বছর আরাকান রাজ গৌড় সালতানাতের পরোক্ষ শাসনাধীন ছিল। এ সময় এই অঞ্চলে মুসলমানদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়। এ সময়কার আরাকান রাজারা যদিও ধর্মে বৌদ্ধ ছিলেন, কিন্তু সালতানাতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে তাঁরা মুসলিম পদবি ধারণ করতেন। এ সময়কার আরাকানি মুদ্রায় কলেমা ও পার্সিয়ান লিপি চালু ছিল।

এ সময় মিন-স-মুনের ভাই আলী খান এবং ছেলে কলিমা শাহ নামে পদবি নিয়ে বা-সো-প্র্রু যথাক্রমে রামু ও চট্টগ্রামের আশপাশের আরো কিছু অঞ্চল পর্যন্ত আরাকান রাজ্য বিস্তৃত করেন। এই রাজবংশের দ্বাদশ রাজা যুবক শাহ পদবিধারী রাজা মিন-বিনের শাসনকালে ১৫৩১ থেকে ১৫৫৩ সাল পর্যন্ত আরাকান রাজ্য সমৃদ্ধির চূড়ান্ত রুপ লাভ করে। তিনি বাংলার সালতানাত থেকে নিজেকে স্বাধীন হিসেবে ঘোষণা করেন। রাজা মিন-বিন পর্তুগিজদের তাঁর সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য নিয়োগ দেন এবং পর্তুগিজ সহযোগিতায় একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। ১৭৮৪ সালে ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে নিলে আবারও বাংলা ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বর্মার যোগাযোগ বেড়ে যায়। এ সময় বর্মার বনজ সম্পদ আহরণ ও অন্যান্য কাজে ব্রিটিশরা ব্যাপকসংখ্যক ভারতীয়কে মিয়ানমারে নিয়ে যায়। ভাগ্যান্বষণে অনেক ভারতীয়, বিশেষ করে বাঙালিরাও সেখানে ভিড় করে। স্থানীয় রাখাইনদের তুলনায় তারা ব্রিটিশদের কাছে বেশি গুরুত্ব লাভ করে এবং সরকারি পদে আসীন হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গোড়ার দিকে, ১৯৪২ সালে, জাপানিরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে মিয়ানমার দখল করে নেয়। স্থানীয় রাখাইনরা এ সময় জাপানিদের পক্ষ নিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত জনগণকে আক্রমণ করে। তাদের আক্রমণের শিকার হয় মূলত রোহিঙ্গা মুসলমানরা। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ রাখাইন অধ্যুষিত মিমবিয়া ও ম্রোহাং টাউনশিপে প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করে রাখাইনরা। পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে উত্তর রাখাইন অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার রাখাইনকে হত্যা করে রোহিঙ্গারা। সংঘাত তীব্র হলে জাপানিদের সহায়তায় রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের কোণঠাসা করে ফেলে।

১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার জাপানিদের দখলে থাকে। এই তিন বছরে কমপক্ষে ২০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে তৎকালীন বাংলায় চলে আসে। সেই যাত্রা এখনো থামেনি। ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশরা আবারও মিয়ানমার দখল করে নেয়। এই দখলে তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে রোহিঙ্গারা। ব্রিটিশরা এ সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে সহায়তার বিনিময়ে উত্তর রাখাইনে মুসলমানদের জন্য আলাদা একটি রাজ্য গঠন করে দেবে তারা। কিন্তু আরো অনেক প্রতিশ্রুতির মতোই ব্রিটিশরাজ এই প্রতিশ্রুতিও রাখেনি। ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ ভাগের সময় রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ আরাকান রাজ্যকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। এ নিয়ে জিন্নাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেন রোহিঙ্গানেতারা। রোহিঙ্গারা একটি বড় সশস্ত্র গ্রুপও তৈরি করে এবং মংদু ও বুথিধাং এলাকাকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে উদ্যোগ নেয়। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, রোহিঙ্গাদের এই উদ্যোগ ছিল আত্মঘাতী এবং মিয়ানমারে বৈষম্যের শিকার হওয়ার পেছনে এটি একটি বড় কারণ। মিয়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সেই সময়কার রোহিঙ্গা উদ্যোগকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে।

বাংলাদেশে যেভাবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সরাসরি সহায়তা করার কারণে বিহারি উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী সাধারণ মানুষের ঘৃণার শিকার হয়েছে, রোহিঙ্গারা সরাসরি সহায়তা না করলেও মিয়ানমারে একই ভাবে বিরূপ জনমতের শিকার। ১৯৬২ সালে মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর ধীরে ধীরে রোহিঙ্গাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৭০ সালের পর থেকে সেনাবাহিনীতে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী থেকে নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে থেকে সরকারি চাকরিতে থাকা রোহিঙ্গারা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মায়ানমারের নাগরিক (রোহিঙ্গা সম্প্রদায়) যারা তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।