বিশেষ প্রতিবেদন
এপ্রিল ১২, ২০২৬, ১২:৩৩ এএম
বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট ও জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে অর্থনীতির নাভিশ্বাস ওঠার দশা; অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য খাতে দেখা দিয়েছে নতুন আতঙ্ক। শিশুদের জীবন রক্ষাকারী যক্ষ্মার বিসিজি টিকা সময়মতো না মেলায় রোগটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক অস্থিরতা যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে, তখন স্বাস্থ্য খাতের এই অব্যবস্থাপনা মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতির ত্রিমুখী চাপে দিশেহারা বাজার : বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে তিনটি প্রধান দিক থেকে চাপের সম্মুখীন, যাকে অর্থনীতিবিদরা ‘ট্রিপল থ্রেট’ বা ত্রিমুখী চাপ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। এই চাপগুলো হলো- অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট।
মূল্যস্ফীতির লাগামহীন ঘোড়া : গত কয়েক মাস ধরে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো তাদের খাদ্য তালিকা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
ডলার ও রিজার্ভের টানাপোড়েন : রপ্তানি আয় এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়লেও ডলারের সংকট কাটছে না। আমদানিকারকরা এলসি খুলতে গিয়ে চরম বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। ফলে কাঁচামাল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে এবং দেশীয় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে আসায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত পূরণ করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট : অর্থনীতির তৃতীয় চাপটি আসছে জ্বালানি খাত থেকে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ওঠানামা করায় এবং অভ্যন্তরীণ ভর্তুকি কমানোর চাপে বারবার বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ও পরিবহন খাতে, যা চূড়ান্তভাবে সাধারণ ভোক্তার পকেট কাটছে।
যক্ষ্মার টিকা সংকট ও জনস্বাস্থ্যের বিপর্যয় : অর্থনৈতিক এই ডামাডোলের মধ্যেই স্বাস্থ্য খাত থেকে এসেছে দুশ্চিন্তার খবর। দেশের সরকারি ইপিআই কর্মসূচির আওতায় শিশুদের যে যক্ষ্মার টিকা দেয়া হয়, তার মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যক্ষ্মার টিকা মিলছে না। অনেক অভিভাবক তাদের নবজাতককে নিয়ে হাসপাতাল থেকে টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে ফিরে আসছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানাচ্ছে, আমদানিতে জটিলতা এবং সরবরাহে সমন্বয়হীনতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কেন শঙ্কা : যক্ষ্মা একটি ছোঁয়াচে ও প্রাণঘাতী রোগ। শিশুদের ক্ষেত্রে বিসিজি টিকা যক্ষ্মার মারাত্মক ধরনগুলো থেকে সুরক্ষা দেয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, টিকাদানে বিরতি: দীর্ঘ সময় টিকা না দিলে শিশুদের মধ্যে যক্ষ্মার প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত: ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে যক্ষ্মা নির্মূলের যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, টিকা সংকটের কারণে তা বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।
আক্রান্তের হার বৃদ্ধি: বর্তমানে বাংলাদেশে যক্ষ্মা শনাক্তের হার বেশ আশঙ্কাজনক। এর মধ্যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার এই অভাব মহামারি পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্য উভয় খাতের এই সংকটের মূলে রয়েছে সঠিক পরিকল্পনার অভাব। ডলার সংকটের কারণে যেমন ওষুধের কাঁচামাল বা টিকা আমদানিতে দেরি হচ্ছে, তেমনি বাজার তদারকিতে ঘাটতি অর্থনীতির সংকটকে ঘনীভূত করছে।
অর্থনীতিবিদ ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘আমরা যদি দ্রুত মুদ্রানীতি এবং রাজস্ব নীতির মধ্যে সমন্বয় করতে না পারি, তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও নিচে নেমে যাবে।’ অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘যক্ষ্মার টিকার মতো জরুরি পণ্যের মজুত কেন শেষ হলো, তার দায় স্বাস্থ্য বিভাগকে নিতে হবে। শিশুদের জীবন নিয়ে এই হেলাফেলা করার সুযোগ নেই।’
সর্বোপরি, অর্থনীতির ত্রিমুখী চাপ সামলাতে সরকারকে একদিকে যেমন কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং করতে হবে, তেমনি ডলার সংকট মেটাতে রেমিট্যান্স ও রপ্তানিতে আরও প্রণোদনা দিতে হবে। ব্যাংক খাতের সংস্কার এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি, স্বাস্থ্য খাতের সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে যক্ষ্মার টিকা আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো দেশের সাহায্য নিয়ে হোক বা দ্রুত বাণিজ্যিক ক্রয়ের মাধ্যমে হোক টিকা সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে আগামী প্রজন্ম এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়বে। দেশের এই ক্রান্তিকালে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত এবং সমন্বিত পদক্ষেপই পারে সাধারণ মানুষকে এই সংকট থেকে মুক্তি দিতে।