ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে 

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬, ১২:১৩ এএম

রাজধানীর নাগরিক জীবনের অন্যতম প্রধান অস্বস্তি ও আতঙ্কের নাম এখন ‘ছিনতাইকারী’। সামপ্রতিক সময়ে রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়কগুলোতে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য চরম আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোরবেলা কর্মস্থলমুখী সাধারণ মানুষ, গভীর রাতে দূরপাল্লার বাস কিংবা ট্রেন থেকে নামা যাত্রী, এমনকি প্রকাশ্য দিবালোকে পথচারী- কেউই এখন নিরাপদ নন। ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাত আর টানাহেঁচড়ায় প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরছে নিরীহ মানুষের, ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ।

ডিবি পুলিশ ও গণমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন স্পটে এখন কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে সংঘবদ্ধ পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয়। রিকশা, সিএনজি কিংবা বাসের জানালা দিয়ে মোবাইল-ব্যাগ টান দেয়া ছাড়াও নির্জন রাস্তায় পথরোধ করে সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার ঘটনা এখন প্রাত্যহিক চিত্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও অপরাধীদের এই বেপরোয়া মনোভাব রাজধানীবাসীকে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। কেবল আইনগত ব্যবস্থা নয়, বরং আধুনিক নজরদারি এবং সামাজিক প্রতিরোধের অভাবই এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা কেবল বাড়েনি, বরং তা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশ প্রশাসন ও গোয়েন্দা বিভাগের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, বিগত কয়েক মাসে ঢাকার অপরাধের গ্রাফ আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। বিগত তিন মাসে (মার্চ, এপ্রিল এবং মে) ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিমতে অন্তত ৮৩টি বড় ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তবেঅপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংখ্যাটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র। কারণ, বেশিরভাগ ঘটনাই পুলিশের নথিতে বা মামলায় রূপ নেয় না।

পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসের তুলনায় সদ্য সমাপ্ত মে মাসে ছিনতাইয়ের প্রকোপ দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। মে মাসে রাতের পাশাপাশি প্রকাশ্য দিবালোকে জনাকীর্ণ এলাকায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সমগ্র ঢাকা মহানগরীতে তিন শতাধিক ছিনতাইয়ের স্পট রয়েছে। তবে এর মধ্যে ৫৫টি পয়েন্টকে ‘হটস্পট’ বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ঘটে যাওয়া প্রধান ২৫টি ছিনতাইয়ের ঘটনার মধ্যে এককভাবে তেজগাঁও বিভাগেই ঘটেছে ৯টি ঘটনা। এর পরই রয়েছে মতিঝিল, গুলশান এবং ওয়ারী বিভাগ (প্রতিটিতে চারটি করে)। রমনা ও লালবাগে রেকর্ড করা হয়েছে দুটি করে ঘটনা। এই তথ্য প্রমাণ করে, বাণিজ্যিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেই অপরাধীদের নজর সবচেয়ে বেশি।

গত কয়েকদিনের মধ্যে রাজধানীর সবচেয়ে আলোচিত ও লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছে মতিঝিলের শাপলা চত্বরের ঠিক মাঝখানে। দেশের প্রধান বাণিজ্যিক ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় ভরদুপুরে এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে ছিনতাইকারীরা। ছায়াঘন ও ব্যস্ততম এই মোড়ে উপস্থিত শত শত মানুষের সামনেই ওই ব্যবসায়ীর সাথে থাকা নগদ টাকা ও বিপুল পরিমাণ মার্কিন ডলার লুটে নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

গুলিবিদ্ধ ব্যবসায়ী যখন রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করছিলেন, অপরাধীরা তখন মোটর সাইকেলে করে অনায়াসে এলাকা ত্যাগ করে। এই ঘটনার পর সপ্তাহের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও পুলিশ এখনো পর্যন্ত এই চাঞ্চল্যকর মামলার কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার বা লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার না হওয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল।

এক দশক আগেও ঢাকার ছিনতাইকারীরা মূলত ‘টানা পার্টি’ বা ‘মলম পার্টি’র খপ্পরে মানুষকে ফেলত। বড়জোর ব্লেড বা চাকু ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন অপরাধীদের হাতে হাতে শোভা পাচ্ছে অবৈধ ও আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ছিনতাইকারীরা আর শুধু মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য অস্ত্র বহন করছে না। তারা সামান্য বাধা পেলেই সরাসরি বুক বা পায়ে গুলি করতে দ্বিধা করছে না। মে মাসে ঘটে যাওয়া অধিকাংশ ছিনতাইয়ের ঘটনায় পিস্তল ও রিভলভারের মতো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

আজ থেকে মাত্র ৬ মাস আগেও ঢাকা মহানগর পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা ছিল ৯৮৯ জন। কিন্তু মাত্র আধ বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা প্রায় দেড় গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৩৮৭ জনে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, এই ১,৩৮৭ জন কেবল তালিকায় থাকা ‘দাগি’ অপরাধী। এর বাইরেও রাজধানীতে সহস্রাধিক ভাসমান ও নতুন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো— মাদকের ভয়াল থাবা: আইস, ইয়াবা ও বিভিন্ন মারণঘাতী মাদকের টাকা জোগাতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক তরুণ এই অন্ধকার জগতে পা বাড়াচ্ছে। কিশোর গ্যাং কালচার: রাজনৈতিক বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে ও পকেট খরচ চালাতে ছিনতাইকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে। অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ভাসমান জনসংখ্যা: কর্মসংস্থানের অভাব এবং গ্রাম থেকে প্রতিদিন ঢাকায় আসা বিপুল সংখ্যক ভাসমান মানুষের একটি অংশ অতি দ্রুত টাকা উপার্জনের আশায় অপরাধের চোরাগলিতে জড়িয়ে পড়ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ছিনতাইকারীদের এই লাগামহীন দৌরাত্ম্যের পেছনে প্রধান কারণ হলো দুর্বল আইনি প্রক্রিয়া এবং জামিনের সহজলভ্যতা। তালিকাভুক্ত ১,৩৮৭ জন ছিনতাইকারীর প্রায় ৮০ শতাংশ সদস্যই এক থেকে সাতটি মামলার সাজাপ্রাপ্ত বা এজাহারভুক্ত আসামি। পুলিশ এদের অনেককেই বিভিন্ন সময়ে বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। কিন্তু আইনি মারপ্যাঁচে তারা খুব দ্রুতই জামিনে মুক্ত হয়ে যায়। কারাগার থেকে বেরিয়ে তারা পুনরায় একই সিন্ডিকেটে যোগ দিয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে ছিনতাই শুরু করে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের অভিমত: ‘মামলা ও জামিনের এই যে দীর্ঘমেয়াদি এবং ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়াগত টালবাহানা- এটি বন্ধ না হলে কোনোভাবেই ছিনতাইকারীদের লাগাম টানা সম্ভব নয়। অপরাধীরা জানে যে, আজ ধরা পড়লে এক বা দুই মাসের মধ্যে তারা আবার রাজপথে ফিরে আসতে পারবে। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই তাদের বেপরোয়া করে তুলছে।’

মতিঝিলের শাপলা চত্বরের চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তর। ডিএমপির উচ্চপর্যায় থেকে একটি জরুরি ‘তারবার্তা’ রাজধানীর ৫০টি থানায় পাঠানো হয়েছে। এই বিশেষ বার্তায় বেশ কিছু কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার: প্রতিটি ক্রাইম জোনে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা তৎপরতা দ্বিগুণ করতে হবে। টহল ও বিশেষ চেকপোস্ট: রাতের পাশাপাশি দিনের ব্যস্ততম সময়েও গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিং ও হটস্পটগুলোতে পুলিশের বিশেষ চেকপোস্ট ও মোবাইল টহল দল মোতায়েন রাখতে হবে। তালিকাভুক্তদের গ্রেপ্তার: ১,৩৮৭ জন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীকে যেখানেই পাওয়া যাবে, অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। জামিনে থাকা আসামিদের ট্র্যাকিং: যেসব দাগি ছিনতাইকারী জামিনে বাইরে আছে, তাদের বর্তমান অবস্থান ও তারা নতুন করে কোনো অপরাধচক্রে যুক্ত হয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

সার্বিক পরিস্থিতি এবং পুলিশের সীমাবদ্ধতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ছিনতাইসহ যে কোনো ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগর পুলিশ সবসময় সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আমাদের টিমগুলো নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে অপরাধীদের গ্রেপ্তারও করছে। তবে মেগাসিটির বিশাল ভৌগোলিক আয়তন এবং বিপুল জনসংখ্যার কারণে শতভাগ অপরাধীকে সবসময় গ্রেপ্তার করে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে গ্রেপ্তারের বাইরে থাকা কিছু অপরাধী আকস্মিকভাবে এসব ঘটনা ঘটিয়ে বসে।’ জামিন প্রসঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন, ‘অনেকেই গ্রেপ্তার হওয়ার কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আবারো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ডিএমপির সব থানায় কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। সক্রিয় ও জামিনে থাকা সব অপরাধীর বর্তমান ডাটাবেজ ধরে কাজ চলছে, খুব দ্রুতই এর সুফল নগরবাসী পাবেন।’

রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের এই লাগামহীন তৎপরতা কেবল একটি সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়, এটি মেগাসিটির সামগ্রিক নাগরিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। পুলিশি টহল বা সাময়িক বিশেষ অভিযান দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে এই অপরাধ কিছুটা কমানো সম্ভব, কিন্তু স্থায়ী সমাধান মিলবে না।

এদিকে পুরো ঢাকা শহর ক্রমান্নয়ে সিসি ক্যামেরার আওতায় আসছে, প্রযুক্তির উন্নয়ন হচ্ছে তবে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন পুলিশের সদিচ্ছা এবং রাজপথে দৃশ্যমান ও কার্যকর অ্যাকশন। যতক্ষণ না পর্যন্ত অপরাধীদের মনে আইনের প্রতি ভয় তৈরি হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ নগরবাসীর এই আতঙ্ক ও দীর্ঘশ্বাস বন্ধ হবে না। নিরাপদ ঢাকা বিনির্মাণে প্রশাসন এখন আরও কঠোর ও আন্তরিক হবে এটাই দুই কোটি ঢাকাবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের অভিমত।