দেশজুড়ে মৌসুমি জ্বরের আতঙ্ক

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২৬, ১২:৩৯ এএম

বর্তমানে দেশজুড়ে এক অদ্ভুত ও রহস্যময় মৌসুমি জ্বরের প্রকোপ জনমনে গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন জ্বর, মাথাব্যথা, তীব্র শরীর ব্যথা এবং শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তবে উদ্বেগের মূল কারণ কেবল জ্বরের প্রাদুর্ভাব নয়, বরং এই জ্বরের ধরণ এবং এর সঙ্গে যুক্ত জটিলতাগুলো।

চিকিৎসকরা লক্ষ্য করেন, অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে প্রচলিত ডেঙ্গু (এনএস১, আইজিএম) কিংবা টাইফয়েড পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ আসছে। তবুও জ্বরের তীব্রতা কমছে না, বরং রোগীদের শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জনমনে এখন একটি বড় প্রশ্ন তবে কি ডেঙ্গু ও টাইফয়েডের বাইরে নতুন কোনো সংক্রামক বা ভাইরাসজনিত রোগ নীরবে বিস্তার লাভ করছে।

হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর স্থায়িত্ব সাধারণ জ্বরের চেয়ে অনেক বেশি; অনেক রোগীর জ্বর ৫ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হচ্ছে। জ্বরের পাশাপাশি রোগীদের মধ্যে তীব্র শারীরিক দুর্বলতা, অনবরত কাশি, বমি, ডায়রিয়া এবং রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

এমনকি অনেকের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, রক্তে সংক্রমণ (সেপসিস) বা অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা হ্রাসের মতো জটিল পরিস্থিতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ জ্বরের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর রোগীর দ্রুত অবনতি ঘটে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) পর্যন্ত যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দু-একটি ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর খবরও পাওয়া যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ককে আরও ঘনীভূত করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল এই জ্বরের পেছনে কেবল একটি কারণ নেই। আবহাওয়া পরিবর্তন, অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে স্ক্রাব টাইফাস, রিকেটশিয়াল ফিভার, লেপ্টোস্পাইরোসিস বা বিভিন্ন ভাইরাল ইনফেকশনের প্রাদুর্ভাব হওয়ার প্রবল সম্ভাবনারয়েছে।

এছাড়া, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে, যা অনেক সময় প্রাথমিক পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। অথচ ডেঙ্গু বা টাইফয়েড নিয়ে অতি-সচেতনতার কারণে অন্য রোগের দিকে নজর বা রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম।

জ্বর কোনোভাবেই হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে তিন দিনের বেশি জ্বর স্থায়ী হলে, শ্বাসকষ্ট, তন্দ্রাচ্ছন্নতা, খিঁচুনি কিংবা গায়ের চামড়ায় কোনো অস্বাভাবিক দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি। চিকিৎসকের মতে, রোগের শুরুতে পরীক্ষার ফলাফল অনেক সময় নেগেটিভ আসতে পারে, তাই রিপোর্ট দেখে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই।

ব্যক্তিগত সচেতনতা, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ থেকে বিরত থাকা এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে পুষ্টিকর ও তরল খাবার গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান এই অস্বাভাবিক জ্বরের পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মহলকে দ্রুত স্ক্রিনিং ও নজরদারি জোরদার করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের এই অনিশ্চিত আতঙ্ক দূর করা সম্ভব হয়।

হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে জ্বর স্থায়ী হওয়ার সময়সীমা ৫ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বরের পাশাপাশি রোগীদের মধ্যে তীব্র দুর্বলতা, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বমি ও ডায়রিয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকদের উদ্বেগের বড় কারণ হলো অনেকের রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং নিউমোনিয়া বা রক্তে সংক্রমণের (সেপসিস) মতো জটিলতা তৈরি হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে জটিল অবস্থা নিয়ে রোগীদের সরাসরি আইসিইউতে স্থানান্তর করতে হচ্ছে এবং দুর্ভাগ্যবশত সাধারণ জ্বরের উপসর্গ নিয়ে এসেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু ও টাইফয়েড নিয়ে অতি-সচেতনতার কারণে অন্যান্য রোগের দিকে নজর কমছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি আগের মতোই বিদ্যমান। জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং মানুষের অবাধ চলাচলের কারণে ম্যালেরিয়ার জীবাণু নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। চট্টগ্রামের কয়েকটি ব্লাডব্যাংকে সম্প্রতি রক্তদাতা স্ক্রিনিংয়ের সময় ম্যালেরিয়া পজিটিভ রোগী শনাক্ত হয়েছে, অথচ তাদের মধ্যে কোনো উপসর্গ ছিল না।

এর অর্থ হলো, ম্যালেরিয়ার উপসর্গবিহীন সংক্রমণ এখনো কমিউনিটির ভেতরে নীরবে বিদ্যমান থাকতে পারে। দীর্ঘকাল বড় আকারের প্রাদুর্ভাব না থাকায় অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ম্যালেরিয়া শনাক্তকরণের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের ব্যবহার ও দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ডা. মিশু তালুকদার বলেন, ‘সব জ্বরই ডেঙ্গু বা টাইফয়েড নয়। ভাইরাল সংক্রমণ, স্ক্রাব টাইফাস, রিকেটশিয়াল ফিভার, লেপ্টোস্পাইরোসিস কিংবা মেনিনজাইটিসের মতো রোগ থেকেও গুরুতর জ্বর হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, জ্বরের শুরুর দিকে কিছু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসতে পারে, তাই রিপোর্ট দেখে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই অ্যান্টিবায়োটিক বা শক্তিশালী ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। বিপৎসংকেতসমূহ : জ্বর তিন দিনের বেশি স্থায়ী হলে, শ্বাসকষ্ট, তন্দ্রাচ্ছন্নতা, খিঁচুনি, খেতে না পারা, প্রস্রাব কমে যাওয়া কিংবা শরীরে লাল দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণ এবং পূর্ণ বিশ্রামের বিকল্প নেই।

বর্তমান মৌসুমি জ্বরের এই রহস্যময় প্রকোপ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ডেঙ্গু পরীক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের স্ক্রিনিং ও নজরদারি বাড়াতে হবে। সীমান্তবর্তী ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ম্যালেরিয়া পরীক্ষার সক্ষমতা পুনরায় জোরদার করা জরুরি। নাগরিক সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমেই কেবল এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ও শারীরিক জটিলতা হ্রাস করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ।