ময়লার ভাগাড়, অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২৬, ০১:০৪ এএম

শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীর ঘেষে গড়ে ওঠা দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়েটি একসময় ছিল নারায়ণগঞ্জবাসীর বিনোদন ও প্রাতঃভ্রমণের অন্যতম প্রধান স্থান। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অবহেলা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং প্রশাসনিক নজরদারির দুর্বলতায় সেই ওয়াকওয়ে এখন পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড় আর অপরাধীদের অভয়ারণ্যে। কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ এখন পথচারীদের জন্য স্বস্তির বদলে নিয়ে এসেছে চরম আতঙ্ক ও ভোগান্তি।

উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিআইডব্লিউটিএ’র মাধ্যমে নির্মিত এই ওয়াকওয়েটি নদীর পাড় দখলমুক্ত ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে তৈরি হয়েছিল। তবে নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই এর অবকাঠামো ধসে পড়তে শুরু করেছে। ৫ নম্বর ঘাট থেকে নিতাইগঞ্জ খালঘাট পর্যন্ত দীর্ঘ এলাকায় রেলিং ভেঙে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণ কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে এই দ্রুত ক্ষয়সাধন হয়েছে। একইসঙ্গে বড় বড় জাহাজ ও ট্রলারের রশি রেলিংয়ের সাথে বাঁধার কারণে লোহার কাঠামো বেঁকে ও ভেঙে গিয়ে পথটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ওয়াকওয়ের সিঁড়িতে বসে বিশুদ্ধ বাতাসের অপেক্ষায় থাকা বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষগুলো এখন উল্টো নাজেহাল হচ্ছেন ময়লার দুর্গন্ধে। টানবাজার ঘাটের চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পথচারীদের চলার পথের কয়েক ফুট সামনেই জমে আছে ময়লার পাহাড়।

অভিযোগ রয়েছে, এলাকার ময়লাবাহী গাড়িগুলো নিয়মিত এখানে আবর্জনা ফেলে যাচ্ছে। এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পথচারীদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। ওয়াকওয়ের নিরাপত্তার বিষয়টি এখন সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের মতে, সূর্যাস্তের পরেই এই পথটি সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় মাদক বেচাকেনা এবং ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে, এই ওয়াকওয়ের পাশেই রয়েছে সদর থানা এবং একটি পুলিশ ক্যাম্প। পুলিশের উপস্থিতি ও নজরদারি না থাকার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা নিয়মিত অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, রেলিংয়ে নৌযানের রশি না বাঁধার বিষয়ে তারা নির্দেশনা দিয়েছেন এবং সরকার এ নিয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। পাশাপাশি, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো সংস্কারের জন্য তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত সুপারিশ পাঠিয়েছেন।

অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী মাদক ও ছিনতাই রোধে তাদের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, নিয়মিত টহল বৃদ্ধির জন্য সদর থানাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে।

এছাড়াও পুরো শহরকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে, যা শেষ হলে ওয়াকওয়েসহ পুরো এলাকা অপরাধমুক্ত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সর্বোপরি, শীতলক্ষ্যা তীরের এই ওয়াকওয়েটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুসফুস ও বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র। বর্তমান বেহাল শহর নাগরিক জীবনের মানকে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম এবং পুলিশের কার্যকর ও ধারাবাহিক টহল নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক সমন্বয় এবং কঠোর নজরদারি থাকলে পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব এই ওয়াকওয়ের হারানো সৌন্দর্য। নগরবাসী চায়, নদীর পাড়ের এই পথটি যেন দ্রুতই ময়লা ও অপরাধমুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের পদচারণায় আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।