রাখাইনের চলমান সংঘাত কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর এই তীব্র সংঘাতের নেপথ্যে রয়েছে এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক আখ্যান, যেখানে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর। এই সংঘাতের আড়ালে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থের প্রতিযোগিতা রাখাইনকে এক নতুন সংঘাতের ল্যাবরেটরিতে রূপ দিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই সংকট বহুমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন রোহিঙ্গা ঢল ও চোরাচালানের মতো উদ্বেগ মোকাবিলা করা আজ সময়ের দাবি। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে মিয়ানমারের এই অস্থিরতা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে, চীন ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সামরিক বাস্তবতার এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশকে গ্রহণ করতে হচ্ছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দূরদর্শী কূটনৈতিক কৌশল।
রাখাইন সংকটের এই নতুন মাত্রা বিশ্লেষণ করা এখন অপরিহার্য, কারণ এটি কেবল একটি দেশের গৃহযুদ্ধ নয়, বরং গোটা অঞ্চলের ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী এক কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। রাখাইনের মংডু ও এর আশপাশের এলাকা এখন বারুদের স্তূপ। জান্তা বাহিনীর বিমান হামলা এবং আরাকান আর্মির পাল্টা প্রতিরোধের ফলে বেসামরিক মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। বিস্ফোরণের বিকট শব্দ বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্ত জনপদগুলোতে নিয়মিত আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে বা প্রাণভয়ে দিশাহারা মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।
সীমান্তের এই অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। গত ৪ জুলাই টেকনাফে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় নাফ নদী ও স্থল সীমান্তে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের নজরদারি বহুগুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ ছাড়া মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচার রোধে এবং ক্যাম্পের বাইরে থাকা রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, রাখাইনের চলমান সংকটের পেছনে বড় একটি কারণ হলো ‘বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর’। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে এই করিডোরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে— স্বার্থের সংঘাত : এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা অনেক আঞ্চলিক ও পশ্চিমা শক্তির জন্য উদ্বেগের বিষয়।
করিডোর ও রোহিঙ্গা সংকট : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সাথে এই করিডোরের একটি পরোক্ষ সংযোগ রয়েছে। করিডোরটি স্থিতিশীল না হলে বড় কোনো বিনিয়োগ ঝুঁকি নেয়া কঠিন। তাই অনেক পক্ষই চায় না এই করিডোরটি বর্তমান অবস্থায় দ্রুত বাস্তবায়িত হোক। পরোক্ষ ইন্ধন : সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. সফিউল্লাহর মতে, করিডোরের বিষয়টি সামনে আসার পরপরই রাখাইনে উত্তজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে কোনো আঞ্চলিক বা বৃহৎ শক্তির সুপ্ত ইন্ধন থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, বিষয়টি কেবল সামরিক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।
বাংলাদেশকে এই করিডোর এবং এর সাথে জড়িত ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা মোকাবিলায় অত্যন্ত সতর্ক ও কৌশলী অবস্থান নিতে হবে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব বাংলাদেশ সীমান্ত এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর মারাত্মকভাবে পড়তে পারে। মেজর (অব.) মো. এমদাদুল ইসলাম চারটি প্রধান ঝুঁকির কথা চিহ্নিত করেছেন— ১. নতুন শরণার্থী ঢল : রাখাইনে মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করলে প্রাণ বাঁচাতে আরও বড় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করার আশঙ্কা রয়েছে।
২. অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান : সংঘাতপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে চোরাকারবারিরা মাদক ও অস্ত্রের অবৈধ বাণিজ্য বাড়াতে পারে। ৩. সীমান্তবর্তী অস্থিতিশীলতা : সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের প্রভাব জনমনে আতঙ্ক তৈরি করছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ৪. সন্ত্রাসবাদের বিস্তার : সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্ত্রাসী আস্তানা গড়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ে, যা মোকাবিলা করতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর করা জরুরি।
সর্বোপরি, রাখাইনের পরিস্থিতি এখন একটি অগ্নিগর্ভ অঞ্চলের মতো। সামরিক বাস্তবতা, চীনের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির মাঝে বাংলাদেশ এক কঠিন অবস্থানে রয়েছে। কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা যেমন জরুরি, তেমনি সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান নেয়া ছাড়া বাংলাদেশের সামনে বিকল্প নেই।
রাখাইনকে ঘিরে এই আঞ্চলিক খেলা কোন দিকে গড়ায়, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে মিয়ানমারের সামরিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক শক্তিরগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। বাংলাদেশ আপাতত ‘সর্বোচ্চ সতর্কতার’ নীতি গ্রহণ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে বিশেষজ্ঞদের দাবি, তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে চাপ প্রয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।