বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরতে এসে পর্যটকদের ফেলে দেওয়া কাচের বোতল (মদ ও বিয়ার) এখন কৃষকদের জন্য বড় আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে। জমি চাষাবাদ করতে গিয়ে পাওয়ার টিলারের লাঙ্গলে কাচের বোতল ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। আর সেই জমিতে বোরো ধান রোপণ করতে গিয়ে বোতলের ভাঙা কাচের টুকরোতে হাত বা পা কাটছে কৃষকদের।
চলতি বছর বোরো মৌসুম শুরু হওয়ার পর ৫-৬টি হাওরে এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক কৃষক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতদের মধ্যে দিন এনে দিন খাওয়া কৃষকেরা কাজ করতে না পেরে মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন।
জানা যায়, বর্ষার শুরু থেকে প্রতিদিন হাউসবোট কিংবা ট্র্যাডিশনাল নৌকায় চড়ে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরতে আসেন হাজার হাজার পর্যটক। সে সময় তারা উপজেলার মাটিয়ান হাওর, বলদা হাওর, সমসার হাওর ও ট্যাকেরঘাট হাওরসহ বিভিন্ন হাওরের ওপর দিয়ে নৌকা করে টাঙ্গুয়ার হাওর, যাদুকাটা নদী ও ট্যাকেরঘাট নিলাদ্রি লেকসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে যাতায়াত করেন। ভ্রমণকে আনন্দময় করে তুলতে অনেকেই নৌকায় বসে মদ ও বিয়ার পান করেন এবং খালি বোতলগুলো হাওরের পানিতে ফেলে দেন। বর্ষা শেষ হলে শুরু হয় বোরো রোপণ মৌসুম। জমি আবাদ করতে পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষাবাদ করার সময় লাঙ্গলের আঘাতে বোতলগুলো ভেঙে কাদার নিচে পানির সাথে মিশে যায়। ফলে কৃষকের চোখে তা পড়ে না। রোপণ কিংবা আগাছা পরিষ্কারের সময় সেই কাচের টুকরোতে কৃষকদের হাত ও পা কেটে যাচ্ছে।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন, মাটিয়ান হাওরপাড়ের বড়দল গ্রামের কৃষক ফজলুল বারি, ফইজুন নুর, বশির মিয়া, হালিম মিয়া, জুয়েল মিয়া ও আব্দুর রব।
এ ছাড়া সমসার হাওরপাড়ের শ্রীপুর গ্রামের কৃষক আলিম মিয়া, হারুন মিয়া এবং ট্যাকেরঘাট হাওরপাড়ের মাটিকাটা গ্রামের কৃষক জমির উদ্দিন ও রইস মিয়াসহ আরও অনেকে। বড়দল গ্রামের বশির মিয়া ও ফইজুন নুর বলেন, "ভাঙা কাচের টুকরোগুলো অত্যন্ত ধারালো। জমিতে হাঁটতে বা চারা রোপণ করতে গেলেই হাত-পা কেটে যাচ্ছে। এখন অনেক কৃষকই কাচ আতঙ্কে ভুগছেন।"
বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জুয়েল মিয়া বলেন, "আমার গ্রামের ১০ জনের বেশি কৃষক মদের বোতলের ভাঙা কাচে আহত হয়েছেন। এটি মেনে নেওয়া যায় না। প্রয়োজনে আগামীতে হাওর পথে পর্যটকদের চলাচল বন্ধ করে দিতে হবে।"
মেঘদূত হাউসবোটের মালিক নিশো দাস বলেন, "এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা পরিবেশের গুরুত্ব দিয়ে হাউসবোট পরিচালনা করার চেষ্টা করি।" কান্ট্রি ট্যুরিজম বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী রাসেল ভূইয়া বলেন, "পর্যটকদের এমন অমানবিক কাজ আশা করা যায় না। পর্যটন স্পটকে ধ্বংস করা যাবে না।"
তাহিরপুর নৌ মালিক সমিতির সভাপতি রব্বানি মিয়া বলেন, "আমার বাড়িও মাটিয়ান হাওরের পাশে। এখানে অনেক কৃষক আহত হয়েছেন। আগামী বর্ষা মৌসুমে সমিতি বিষয়টি আরও কঠোরভাবে দেখবে।"
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, "আমি শুনেছি জমি রোপণ করতে গিয়ে অনেক কৃষক আহত হয়েছেন। পর্যটকদের এমন আচরণ অব্যাহত থাকলে হাওরে কৃষির পরিবেশ ধ্বংস হবে। হাওর ভ্রমণে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।"
ইএইচ