মিরসরাইয়ে গ্যাস সিলিন্ডারবাহী ট্রাক উল্টে বিভীষিকা: মহাসড়কে মরদেহ ও সিলিন্ডারের স্তূপ

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২৬, ০২:১৩ পিএম

সকাল তখন সাড়ে আটটা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই উপজেলার নিজামপুর বাজার এলাকা প্রতিদিনের মতোই ব্যস্ত হয়ে উঠছিল। হঠাৎ এক বিকট শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারপাশ। মুহূর্তের মধ্যেই বাজারের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা আঁতকে ওঠেন। দোকানপাট থেকে বেরিয়ে তারা যা দেখলেন, তা ছিল এক বীভৎস দৃশ্য। একটি গ্যাস সিলিন্ডার বোঝাই ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজকে ধাক্কা দিয়ে দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে, আর চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শত শত সিলিন্ডার। কাছেই পড়ে ছিল এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির থেঁতলে যাওয়া প্রাণহীন দেহ।

সোমবার সকালে মিরসরাইয়ের নিজামপুর বাজার এলাকায় ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট ও তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

সকাল ৯টায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিজামপুর বাজারের পদচারী-সেতুর (ফুটওভার ব্রিজ) ঠিক নিচেই মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনে ট্রাকটি (ঢাকা মেট্রো-ট-...) কাত হয়ে পড়ে আছে। ট্রাকের বডি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শতাধিক এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার পুরো মহাসড়কে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ট্রাকটির সামনের অংশটি দুমড়েমুচড়ে যাওয়ায় এর চালক ও সহকারীর অবস্থা কী হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব হয়নি।
সড়ক বিভাজকের ওপর থেঁতলে যাওয়া অবস্থায় পড়ে থাকা অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির লাশটি দেখে পথচারীদের মধ্যে শিউরে ওঠার মতো অবস্থা তৈরি হয়। ধারণা করা হচ্ছে, নিহত ব্যক্তি একজন পথচারী ছিলেন, যিনি মহাসড়ক পার হচ্ছিলেন অথবা ট্রাকটি উল্টে যাওয়ার সময় এর চাপায় পড়ে প্রাণ হারান।

দুর্ঘটনার পর পরই এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী মানুষ রাস্তায় ছড়িয়ে পড়া গ্যাস সিলিন্ডারগুলো সরিয়ে নেওয়ার বা চুরির চেষ্টা করে। তবে নিজামপুর বাজারের সচেতন স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ভ্যানচালক মো. সালাউদ্দিন জানান, ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিভাজকে ধাক্কা দেওয়ার পর সব সিলিন্ডার ছিটকে পড়ে। বিকট শব্দ শুনে আমরা দৌড়ে আসি। দুর্ঘটনার পর কিছু লোক সিলিন্ডারগুলো নিয়ে যাওয়ার তালে ছিল, কিন্তু আমরা সবাই মিলে পাহারা দিয়েছি যাতে কেউ একটি সিলিন্ডারও চুরি করতে না পারে।

দুর্ঘটনার ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনে সম্পূর্ণ যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রামমুখী যানবাহনগুলোকে পাশের একটি সরু বিকল্প রাস্তা দিয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে চলাচল করতে হয়। এর ফলে নিজামপুর বাজার থেকে বড়তাকিয়া বাজার পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সকাল সাড়ে ৮টায় দুর্ঘটনা ঘটলেও ৯টা ২০ মিনিট পর্যন্ত দুর্ঘটনাস্থলে হাইওয়ে পুলিশের কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। এতে উদ্ধারকাজ শুরু হতে দেরি হয় এবং যানজট পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে।

সকাল ১০টার দিকে কুমিরা হাইওয়ে পুলিশের সার্জেন্ট শামীম হোসেন জানান যে, খবর পাওয়ার পরপরই তাদের একটি টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। তিনি বলেন:

উদ্ধারকাজ: একটি শক্তিশালী ক্রেন ব্যবহার করে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাকটি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

লাশ শনাক্তকরণ: নিহত ব্যক্তি একজন পথচারী ছিলেন বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। পিবিআই-এর সহায়তায় তার পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।

নিখোঁজ চালক: দুর্ঘটনার পরপরই ট্রাকের চালক এবং সহকারী সেখান থেকে পালিয়ে গেছেন নাকি আহত অবস্থায় কোথাও রয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই দুর্ঘটনা আবারও মহাসড়কে অনিয়ন্ত্রিত ও অনিরাপদভাবে গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহনের ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে এসেছে। সিলিন্ডারগুলো ট্রাকে যেভাবে সাজানো ছিল এবং দুর্ঘটনার সময় যেভাবে সেগুলো ছিটকে পড়েছে, তাতে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারত। ভাগ্যক্রমে কোনো সিলিন্ডার লিক না হওয়ায় নিজামপুর বাজার বড় ধরনের অগ্নিসংকট থেকে রক্ষা পেয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন হলেও মিরসরাইয়ের এই নিজামপুর এলাকাটি এখন দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠছে। স্থানীয়দের দাবি, মহাসড়কের এই অংশে বাঁক এবং পদচারী-সেতুর নিচে দ্রুতগতির যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা প্রায়ই ঘটে। আজকের এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তির পরিচয় যেমন দ্রুত নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন, তেমনি মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাকের গতি নিয়ন্ত্রণ ও ফিটনেস নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।

এএন