রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমী সবজি ক্ষেতে পাখির উপদ্রব থেকে ফসল রক্ষার্থে কৃষকের পেতে রাখা কারেন্ট জালে আটকা পড়ে নির্বিচারে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি মরছে। পরিবেশবান্ধব এসব পাখির মৃত্যুতে কৃষকদের মধ্যে কোনো ভ্রূক্ষেপ বা আফসোস দেখা যাচ্ছে না। এতে করে পরিবেশের জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে পড়েছে।
নির্বিচারে পাখি হত্যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের কোনো পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। এমনকি কৃষকদের সচেতন করার ব্যবস্থাও কেউ নেয়নি। উপজেলার চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমিতে নানান ধরনের সবজির আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বেগুন ও টমেটোর ক্ষেতে পাখির উপদ্রব থাকায় কৃষকরা ফসল রক্ষার্থে অনেক পদ্ধতি অবলম্বন করে।
ক্ষেতের মধ্যে খুঁটি পুঁতে বিভিন্ন রঙের ফিতা টাঙানো বা কাকতাড়ুয়া স্থাপনের মতো পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি থাকলেও অনেক এলাকায় এখন কারেন্ট জাল দিয়ে পুরো ক্ষেত ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে ওই ক্ষেতে আসা বক, পেঁচা, শালিক, ঘুঘু, বাঁদুর ও চড়ুইসহ বিভিন্ন দেশীয় পাখি জালে আটকা পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে।
উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়ন চরকর্ণেশন এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী জানান, তিনি প্রায় ২ বিঘা জমিতে টমেটো আবাদ করেছেন। ক্ষেতে পাখি বসে ঠোকা দিয়ে অনেক টমেটো নষ্ট করে ফেলছে। বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করেও পাখি ঠেকানো যায়নি বলে তিনি বাধ্য হয়ে কারেন্ট জাল ব্যবহার করেছেন। জালে পাখি আটকা পড়লেও তিনি ছেড়ে দেন বলে দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, ধার দেনা করে চাষবাস করি এবং ফসল বিক্রির টাকা দিয়ে তা পরিশোধ করতে হবে। এজন্য বাধ্য হয়েই ক্ষেতে কারেন্ট জাল ব্যবহার করেছি। তবে একই এলাকার কৃষক মোবারক খাঁ বলেন, কিছু সবজি ক্ষেতে পাখি ক্ষতি করলেও অনেক সময় ক্ষতিকর পোকা খেয়ে তারা ফসলের উপকার করে।
তাঁর মতে, পাখি মারা যাওয়ার মতো কারেন্ট জাল পদ্ধতি ব্যবহার করা ঠিক না। বিকল্প হিসেবে ক্ষেতের চারদিকে নানা রঙের পাতলা ফিতা টাঙিয়ে পাখির উপদ্রব থেকে সবজি রক্ষা করা য়ায়। বাতাসে এই ফিতার শব্দে পাখি ভয় পেয়ে ক্ষেতে তেমন একটা বসে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক কৃষক জানান, ৩ বিঘা জমিতে টমেটোর আবাদে পাখির উপদ্রব ঠেকাতে তিনি জালের ঘেরা দিয়েছেন।
তিনি স্বীকার করেন, জালে অনেক পাখি রাতে আটকা পড়ে মারা গেছে। ফসল রক্ষার্থে তাঁদের এই ব্যবস্থা করতে হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, গোয়ালন্দ নদীমাতৃক এলাকা হওয়ায় কৃষকরা জেলেদের কাছ থেকে সহজেই কম দামে পুরনো কারেন্ট জাল সংগ্রহ করতে পারেন।
এর ফলে কৃষকরা এই পদ্ধতিতে সবজি রক্ষায় আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। অথচ কারেন্ট জালের ফাঁদে পড়ে নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে পরিবেশবান্ধব দোয়েল, শালিক, বুলবুলি, পেঁচা ও চড়ুইসহ নানা প্রজাতির পাখি। পাখিপ্রেমীরা মনে করছেন, স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের নীরব ভূমিকা থাকায় এই বিপদজনক পদ্ধতি ব্যবহার করে পাখি নিধন করা হচ্ছে।
তবে প্রশাসন বলছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুতই ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রকৃতিকে সুন্দর করে রাখে পাখি এবং অনেক পাখি ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসলকে রক্ষা করে থাকে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার্থে প্রশাসনের এখনই পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার জানান, খাদ্যের চাহিদা মেটাতে ফসল উৎপাদনের যেমন বিকল্প নেই, ঠিক তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পশু পাখিরও বিকল্প নেই। পাখি যতটুকু না ফসলের ক্ষতি করে, ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি উপকার করে।
তিনি উল্লেখ করেন, পাখি তাড়াতে কারেন্ট জালের মতো মৃত্যু ফাঁদ ব্যবহার করা উচিত নয়। কৃষি বিভাগ বিভিন্ন সময় এটা না করার জন্য কৃষকদের পরামর্শ ও সচেতন করে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
জেএইচআর