তুচ্ছ একটি বিষয় চুলার ছাই অন্যের জমিতে ফেলা। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় বাগ্বিতণ্ডা, আর মুহূর্তেই তা রূপ নেয় সহিংসতায়। মাথায় ইটের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী অসহায়, বিধবা ও নিঃসন্তান ছামেনা খাতুন।
বর্তমানে তিনি বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। ঘটনাটি ঘটেছে বাগাতিপাড়া উপজেলার কাজিরচক গ্রামের মালঞ্চী এলাকায়।
দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ছামেনা খাতুন। বাবার বাড়ির ভিটেতে মানুষের সহায়তায় পাওয়া এক বান্ডিল টিন দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি সাপড়া ঘরই তার একমাত্র আশ্রয়। বয়স্ক ভাতার সামান্য টাকা এবং মানুষের বাড়িতে ফরমায়েশ খেটে যা পান, তা দিয়েই চলে তার জীবন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চুলার ছাই অন্যের জমিতে ফেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী নবরুল ইসলামের স্ত্রী নাজমা বেগম (৪৮) ও ছেলে নাইম (৩০) এর সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি শুরু হয়। অভিযোগ, একপর্যায়ে ছামেনার মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে ছামেনা খাতুন বলেন, “আমার মাথায় আঘাতের পরে শেলাই দিতে হয়েছিল। মাথার ভেতরে চিনচিন করে আর কামড়ায়। আমি রক্তমাখা শাড়ি-ওড়না নিয়ে বিচার চেয়ে অনেক জায়গায় ঘুরেছি, ন্যায় পাইনি। গ্রামের সমাজপ্রধান কাজেম উদ্দিন বলেছেন, আগে চিকিৎসা নিয়ে ভালো হও, তারপর বিচার করে দেওয়া হবে।”
তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি নতুন করে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তার প্রশ্ন “এই ঘটনা থানা-পুলিশ আর সাংবাদিকরা জানলে আমার আরও বেশি বিপদ হবে না তো?”
স্বজনহীন এই বৃদ্ধা আশঙ্কা করছেন, অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে আরও হয়রানি বা চাপের মুখে পড়তে পারেন।
ঘটনার বিষয়ে বাগাতিপাড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনজুরুল আলম বলেন, “এই থানায় যার কেউ নেই, তার জন্য আমি আছি। আমি ওই মহিলাকে হাসপাতালে দেখতে যাব এবং যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করব।”
অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈকত মো. রেজওয়ানুল হক জানান, “রোগীকে বিনা খরচে আমাদের সাধ্যমতো পরিচর্যা ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। মাথায় আঘাতের ক্ষত রয়েছে, তাই নিয়মিত ড্রেসিং করতে হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ সেরে উঠতে সময় লাগবে।”
তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু আশ্বাস নয় ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ বিচার চাইতে গিয়ে যদি একজন অসহায় নারী আরও অনিরাপদ বোধ করেন, তবে সেটি সমাজ ও প্রশাসনের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
গ্রামবাসীরা বলেন, “ওনার নিজের বলতে কেউ নেই। এমন মানুষকে মারধর করা খুবই দুঃখজনক। আমরা বলেছি আগে চিকিৎসা নিতে। পরে একটি সুষ্ঠু ফয়সালা করে দেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বৃদ্ধা নারীর ওপর এমন হামলা সমাজে সহমর্মিতা ও মানবিকতার ঘাটতিরই প্রতিচ্ছবি। তার ওপর এখন যোগ হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা।
গ্রামের সাধারণ মানুষের দাবি, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে ও দরিদ্র-স্বজনহীন মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে প্রশাসন ও সমাজকে।
এএন