ইবি শিক্ষিকা হত্যার ঘটনায় ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০২৬, ০২:৩৪ পিএম

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইতিহাসে এক কলঙ্কিত দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে গত বুধবার। নিজ কর্মস্থলে বিভাগের পিয়ন বা অফিস সহকারীর হাতে বিভাগীয় প্রধানের প্রাণ হারানোর ঘটনায় স্তব্ধ পুরো ক্যাম্পাস। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অবশেষে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে নিহত শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া রুনার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান বাদী হয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় মূল অভিযুক্ত হিসেবে নাম রয়েছে একই বিভাগের অফিস সহকারী ফজলুর রহমানের। এছাড়া তার সঙ্গে আরও তিনজনকে সহযোগী হিসেবে আসামি করা হয়েছে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মোশাররফ হোসেন একাডেমিক ভবনের সমাজকল্যাণ বিভাগে নিজ কক্ষে কাজ করছিলেন সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা। এসময় তুচ্ছ কোনো দাপ্তরিক বিষয় বা ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে অফিস সহকারী ফজলুর রহমান ধারালো ছুরি নিয়ে তার ওপর চড়াও হয়।

বিভাগীয় প্রধানের কক্ষ থেকে আর্তচিৎকার ও ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে শিক্ষার্থীরা সেখানে ছুটে যান। কক্ষের ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকায় তারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখতে পান। সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিলেন আসমা সাদিয়া রুনা। পাশে ঘাতক ফজলুর রহমানও রক্তাপ্লুত অবস্থায় পড়ে ছিল। জানা গেছে, শিক্ষিকাকে হত্যার পর ফজলুর নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

শিক্ষার্থীরা দ্রুত দুজনকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আসমা সাদিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, ঘাতক ফজলুর রহমান বর্তমানে পুলিশি পাহারায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার বাদ জোহর কুষ্টিয়া ঈদগাহ ময়দানে মরহুমা আসমা সাদিয়া রুনার জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর তাকে কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হবে। এই মেধাবী শিক্ষিকার অকাল মৃত্যুতে তার পরিবার, সহকর্মী এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মাঝে শোকের মাতম চলছে। সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় শিক্ষিকাকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ। তাদের দাবি, এই হত্যাকাণ্ড কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, বরং এটি পরিকল্পিত একটি হামলা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঘাতক ফজলুর রহমানের অবস্থা এখনও অত্যন্ত সংকটাপন্ন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়ায় তাকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ফজলুর রহমান সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গ্রেফতারি পরোয়ানা দিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হবে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, আমরা মামলার এজাহার গ্রহণ করেছি। প্রাথমিক তদন্তে ফজলুর রহমানের একক ও সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেও বাকি তিন আসামির ভূমিকা কী ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এমন চাঞ্চল্যকর হত্যার পেছনে কোনো দীর্ঘদিনের শত্রুতা বা বিশেষ উসকানি ছিল কি না, তা বের করাই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

এই নজিরবিহীন ঘটনার পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে একজন তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী কীভাবে ধারালো অস্ত্র নিয়ে বিভাগীয় প্রধানের কক্ষে প্রবেশ করে এমন হামলা চালাতে পারে, তা নিয়ে প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা চলছে।

শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে কালবিলম্ব না করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এই মামলার বিচার দাবি করেছেন। তারা বলছেন, একজন শিক্ষক যদি তার বিভাগীয় কক্ষেই নিরাপদ না থাকেন, তবে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা অসম্ভব।

আসমা সাদিয়া রুনা কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন গবেষক এবং বহু শিক্ষার্থীর আলোকবর্তিকা। তার এই মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, বরং দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনের জন্য এক বড় আঘাত। এখন সাধারণ শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের একটাই দাবি তদন্তের মাধ্যমে নেপথ্যের কুশীলবদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

এএন