জ্বালানি সংকটে বিপাকে পাহাড়ের আমচাষি, অনিশ্চয়তায় সোনালি মৌসুম

গুইমারা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি প্রকাশিত: এপ্রিল ২, ২০২৬, ০৩:২১ পিএম

পাহাড়ের ঢালে ঢালে বিস্তৃত সবুজের সমারোহ। টিলা আর উপত্যকা জুড়ে সারি সারি আমগাছ গাছে গাছে ঝুলছে সম্ভাবনার সোনালি ফল। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজ হাতে এঁকেছে এক অনিন্দ্য সুন্দর কৃষি-চিত্র। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে গভীর দুশ্চিন্তা। জ্বালানি সংকটের করাল ছায়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার আমচাষিরা।

চলতি মৌসুমে গুইমারা উপজেলার প্রায় ১,২৮০ হেক্টর জমিতে আমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। মৌসুমের শুরুতে গাছে গাছে মুকুল আসায় চাষিদের চোখে ছিল আশার আলো। অনেকেই আগাম হিসাব কষে নিয়েছিলেন ঋণ শোধ হবে, সংসারে ফিরবে স্বচ্ছলতা, সন্তানের পড়াশোনার খরচও মিটবে সহজেই। কিন্তু দীর্ঘ অনাবৃষ্টি সেই স্বপ্নে প্রথম ধাক্কা দেয়। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় অনেক মুকুল ঝরে পড়ে। তবুও আশা ছাড়েননি চাষিরা। তারা ভেবেছিলেন, যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে অবশিষ্ট ফলন রক্ষা করা সম্ভব হবে। কিন্তু ঠিক তখনই নতুন করে দেখা দেয় জ্বালানি সংকট যা এখন তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ।

বর্তমান বাণিজ্যিক আমচাষ অনেকাংশেই নির্ভরশীল আধুনিক যন্ত্রপাতির ওপর। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় সেচ ও স্প্রে কার্যক্রমে যন্ত্রের ব্যবহার অপরিহার্য। ফল টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত সেচ এবং কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে জরুরি, যা চালাতে প্রয়োজন জেনারেটর আর জেনারেটরের জন্য দরকার ডিজেল ও অকটেন। কিন্তু বর্তমানে বাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট। ফলে সময়মতো সেচ ও স্প্রে করতে পারছেন না চাষিরা। এতে ফল ঝরে পড়া, পোকামাকড়ের আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। গুইমারা উপজেলার বড়পিলাক, হাফছড়ি, হাতিমুড়া, তৈকর্মা, মুসলিমপাড়া ও কবুতরছড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে বাগানে ফল আছে, কিন্তু পরিচর্যার অভাবে তা ঝুঁকির মুখে।

বড়পিলাক এলাকার এক আমচাষি বলেন, “আমাদের বাগানে আম্রপালি, হাঁড়িভাঙ্গা, বেনানা, গোপালভোগ, হিমসাগর ও মল্লিকা জাতের আম ধরেছে। কিন্তু অকটেনের অভাবে ঠিকমতো স্প্রে করতে পারছি না। বড় বাগানে হাতে কাজ করা সম্ভব নয়।

আরেকজন চাষি জানান, মুকুল ভালো এসেছিল, এখন ফলও আছে। কিন্তু ডিজেল-অকটেন না থাকায় সেচ ও স্প্রে করতে পারছি না। দ্রুত সমাধান না হলে বড় ক্ষতি হবে।

গুইমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম জানান, আমরা সব সময় পরামর্শ দিয়ে চাষিদের সহযোগিতা করছি। এই সময়টি আমচাষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনাবৃষ্টির কারণে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। এর সঙ্গে যদি সময়মতো বালাইনাশক প্রয়োগ না করা হয়, তাহলে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, নিয়মিত সেচ ও অনুমোদিত বালাইনাশক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে ফলন অনেকটাই রক্ষা করা সম্ভব। বর্তমান সংকট মোকাবেলায় চাষিদের আবেদনের প্রেক্ষিতে কৃষি অফিস টোকেন দিচ্ছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ অকটেন সরবরাহের চেষ্টা করা হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিসকাতুল তামান্না জানান, জ্বালানি সংকট নিরসনে স্থানীয় তেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। গুইমারায় নিজস্ব ডিলার না থাকায় মাটিরাঙ্গার ডিলারের মাধ্যমে তেল সংগ্রহ করতে হয় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের, যা সংকটকে আরও বাড়িয়েছে।

তিনি বলেন,প্রকৃত চাষিদের তালিকা করে টোকেনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ অকটেন সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। সংকট সমাধানে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি। সরবরাহ সীমিত হওয়ায় সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি কালোবাজারি বা অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি রোধে বাজার মনিটরিং অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

গুইমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিশেষ উদ্যোগে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি আসলেও অনেক চাষির অভিযোগ টোকেন পেলেও সরবরাহ কম থাকায় জ্বালানি কখন পাবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পাহাড়ি অঞ্চলের অর্থনীতিতে আম একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। একটি সফল মৌসুম মানে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়। বিপরীতে, একটি ব্যর্থ মৌসুম পুরো এলাকার অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে সময়ই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। দ্রুত জ্বালানি সংকট সমাধান না হলে চোখের সামনে থাকা সোনালি সম্ভাবনা হারিয়ে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন একটাই সময়ের আগে কি কাটবে এই সংকট, নাকি পাহাড়ের আমচাষিদের আবারও ক্ষতির মুখে পড়তে হবে? পাহাড়ের নিঃশব্দ বাগানগুলো যেন সেই উত্তরের অপেক্ষায় দিন গুনছে।

জেএইচআর