পাথর বিক্রি বন্ধে সংকটে মধ্যপাড়া খনি, বন্ধের শঙ্কা

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম

দেশের উত্তরাঞ্চল তথা বাংলাদেশের একমাত্র পাথর খনি দিনাজপুরের মধ্যপাড়ায় অবস্থিত। তৎকালীন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় এই এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে উত্তর কোরিয়ার নামনাম কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে খনিটির অবকাঠামো উন্নয়ন ও উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়। 

তবে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে না পারায় ওই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে পরবর্তীতে ২০১৪ সালে জার্মানিয়া-টেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)-এর সঙ্গে নতুন চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত ব্যয়ে পাথর উত্তোলন শুরু করা হয়। জিটিসি খনিটির বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন করে উৎপাদন বাড়িয়েছে, যদিও বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি ও শ্রমিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

খনি সূত্রে জানা যায়, মধ্যপাড়া পাথর খনিতে দিন দিন পাথরের মজুদ বাড়ছে। পাথর বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে খনিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ পাথর বিক্রি না হওয়ায় খনিটি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। স্ট্যাক ইয়ার্ডে প্রায় ১৩ লাখ টন পাথর জমে থাকায় এক মাসের মধ্যেই উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও জানা গেছে, খনির ২৫টি স্ট্যাক ইয়ার্ডে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন পাথর অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ৪০-৬০ মিলিমিটার আকারের ব্যালাস্ট পাথর, যা মূলত বাংলাদেশ রেলওয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু রেলওয়ের ক্রয় কমে যাওয়ায় প্রায় ৮ লাখ ৬৭ হাজার টন পাথর বিক্রি হচ্ছে না।

খনি কর্তৃপক্ষ জানান, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে দেশীয় পাথরের পরিবর্তে ভারত ও ভুটান থেকে আমদানিকৃত পাথরের ব্যবহার বেড়েছে। এতে দেশীয় পাথরের বাজারে ভাটা পড়েছে। মধ্যপাড়ার প্রধান ক্রেতা বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এই দুই সংস্থার ক্রয় কমে যাওয়ায় বিক্রি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এছাড়া উন্নয়নমূলক মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের অভাবেও মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহারে আগ্রহ কম।

খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এম. জোবায়েদ হোসেন বলেন, উৎপাদনের তুলনায় বিক্রি না হওয়ায় স্ট্যাক ইয়ার্ড পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই উৎপাদন বন্ধ করতে হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটের আরেকটি বড় কারণ পরিবহন সমস্যা। মধ্যপাড়া খনি থেকে ভবানীপুর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার রেললাইন দীর্ঘদিন ধরে অকেজো পড়ে আছে। রেললাইন চুরি হয়ে যাওয়ায় সেটি পুনরায় সংস্কার করে পাথর পরিবহন শুরু করা গেলে কম খরচে পরিবহন সম্ভব হতো। বর্তমানে সড়কপথে পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় পাথরের দামও বেড়ে যাচ্ছে, যা আমদানিকৃত পাথরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাধা সৃষ্টি করছে।

জানা গেছে, জিটিসি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক দশকে খনির উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে নামনাম কোম্পানি প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৭০০ টন পাথর উত্তোলন করত, এখন সেখানে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টন পাথর উৎপাদন করছে জিটিসি। এর ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে খনিটি লাভজনক অবস্থায় যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিক্রি কমে যাওয়ায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবার লোকসানে পড়েছে খনিটি।

অন্যদিকে, দেশে বিপুল পরিমাণ পাথর অবিক্রীত থাকলেও বিদেশ থেকে পাথর আমদানি কমেনি। বাংলাদেশে বছরে পাথরের চাহিদা প্রায় ২ থেকে ২.৫ কোটি টন। এর বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ২ কোটি ৪৮ লাখ টন পাথর আমদানি হয়েছে, যার বাজার মূল্য প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও প্রায় একই পরিমাণ পাথর আমদানি করা হয়েছে।

মধ্যপাড়ার পাথরের গুণগত মান অত্যন্ত ভালো, যা প্রায় ২৫ হাজার পিএসআই চাপ সহ্য করতে সক্ষম। এই পাথরের ব্যবহার বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গণপূর্ত, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে দেশীয় পাথর ব্যবহারে উদ্যোগ বাড়াতে হবে এবং আমদানি নির্ভরতা কমাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এএন