এক দিন রোদ, দুই দিন বৃষ্টি-তার সঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা ঢল। অনিয়মিত আবহাওয়া ও পাহাড়ি পানির চাপে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে। এতে প্রায় ৩৪ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে বেসরকারি সূত্রের ধারণা, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন। শুধু ইটনাতেই প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। নিকলী, বাজিতপুর, তাড়াইল ও করিমগঞ্জের হাওরগুলোতেও একই পরিস্থিতি-পাকা ধান পানির নিচে, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
টানা বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে কৃষক-শ্রমিকরা মাঠে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। দিনে দুই হাজার টাকা মজুরিতেও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় ৬০০টি হারভেস্টার মেশিন পানিতে ডুবে থাকা জমিতে কাজ করতে পারছে না। ফলে সময়মতো ধান কাটার ঝুঁকি বাড়ছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে কাটা ধানও সমস্যায় পড়েছে-রোদ না থাকায় ধান শুকানো যাচ্ছে না, অনেক জায়গায় ভেজা ধানে অঙ্কুর গজিয়ে উঠছে।
ধনু, মেঘনা, বৌলাই, মগড়া, কালনী, কুশিয়ারা, দাইরা, ঘোড়াউত্রা ও ধলেশ্বরী নদীর পানি ক্রমাগত বাড়ছে। কোথাও কোথাও নদীর পানি উপচে হাওরে প্রবেশ করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বিভিন্ন পয়েন্টে পানির স্তর বাড়লেও তা এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে বৃষ্টি ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে আগাম বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদীর পানির স্তর ৩.১৬ মিটার থেকে বেড়ে ৩.২৬ মিটারে পৌঁছেছে। একইভাবে চামড়াঘাট পয়েন্টে মগড়া নদীর পানি ২.৭৮ মিটার থেকে ২.৯৫ মিটারে এবং অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি ২.৪০ মিটার থেকে ২.৫৮ মিটারে উন্নীত হয়েছে। ভৈরব বাজার পয়েন্টে মেঘনা নদীর পানি কিছুটা কমে ১.৭২ মিটারে নেমেছে।
কয়েক দিন আগেও হাওরে ছিল ধান কাটার উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু হঠাৎ পানির চাপ বাড়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।
কৃষকরা রোদ পেলে দ্রুত মাঠে নেমে কোমরপানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন। ভেলা ও নৌকায় করে ধান উঁচু জায়গায় নেওয়া হচ্ছে। কোথাও সড়কই খোলা হিসেবে ব্যবহার করে ধান শুকানো হচ্ছে।
নিকলীর মজলিশপুর, করিমগঞ্জের বড় হাওর ও বালিখলায় একই দৃশ্য দেখা গেছে-ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর লড়াই চলছে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।
মজলিশপুর হাওরের কৃষক আব্দুল আলী বলেন, তিনি ১২ একর জমিতে ধান করেছিলেন, অর্ধেক কাটতে পেরেছেন, বাকি ধান পানির নিচে। আর দুই দিন সময় পাইলেই সব কাটতে পারতাম।
মিঠামইনের গোপদীঘির কৃষক রইসউদ্দিনের ৩০ একরের বেশিরভাগই তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, মেশিনে কাটা যায় না, শ্রমিকও নাই-ধান জমিতেই নষ্ট হইতেছে।”
ইটনার কৃষক রতন মিয়া মহাজনের ঋণ নিয়ে ১০ একর জমিতে চাষ করেছিলেন, কিন্তু এবার এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। নিয়ামত গ্রামের কৃষক আবু হানিফ প্রশ্ন করেন, পরিবার লইয়া এখন কেমনে চলব?
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. সাদেকুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন।
সরকার ৩৬ টাকা কেজি দরে ১৮ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কৃষকদের মতে, এই পরিমাণ অত্যন্ত অপ্রতুল।
ভেজা ধানের কারণে কৃষকরা গুদামে সরবরাহ করতে পারছেন না। ফলে বাজারে ধানের দাম নেমে এসেছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণে, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম।
হাওরের কৃষকের কাছে বোরো ধানই একমাত্র ফসল। সেই ফসল পানিতে তলিয়ে গেলে পুরো বছরের জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
এবারও সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। আবহাওয়া ও পানির ওপর নির্ভরশীল এই অঞ্চলে কৃষকের লড়াই এখন সময়ের বিরুদ্ধে-আর এই লড়াইয়ের ফল নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দিনের রোদ ও বৃষ্টি।
এম জি