শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যাচ্ছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ১৯, ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনা আজ শুক্রবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে না বলে নিশ্চিত করেছে সুইজারল্যান্ড।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ড সফরের পরিকল্পনা হঠাৎ বাতিল করায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাকে নতুন করে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “এ আলোচনার সার্বিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা কখনোই সহজ বা আগে থেকে অনুমান করার মতো ছিল না।”

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ামাত্রই জেডি ভ্যান্স ও মার্কিন প্রতিনিধিদল রওনা হওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল।

সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক নামের একটি পার্বত্য অবকাশকেন্দ্রে এই শীর্ষ আলোচনা হওয়ার কথা ছিল এবং আলোচনা স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানায়নি। এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

অবশ্য গত বুধবার ১৪ দফার একটি প্রাথমিক চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও অন্তত ৬০ দিন বাড়ানোর পর ইরান জানিয়েছিল, তারা কারিগরি আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত।

তবে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের সফর স্থগিতের ঘোষণার আগেই ইরান শর্ত দিয়েছিল যে আলোচনার আগে অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট পদক্ষেপ দেখতে হবে।

একই সঙ্গে ইরানের প্রতিনিধিদল সুইজারল্যান্ডের ওই অবকাশ কেন্দ্রে যাবে কি না, সে বিষয়েও তেহরানের পক্ষ থেকে আগে থেকে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন যে, সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের চুক্তির একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।

তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে জানায়, উভয় দেশের প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যে চুক্তিতে সই করায় এমন কোনো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়।

এই সংঘাতের ফলে এ পর্যন্ত অন্তত ৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।

এদিকে এই শান্তি আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ বাদ পড়া ইসরায়েল নিজেদের এই চুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে এবং লেবাননে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রেখেছে।

ইসরায়েলের এই অনড় অবস্থানের কারণেও শান্তি চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত টিকবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বড় প্রশ্ন উঠেছে। ওয়াশিংটনে কংগ্রেসের ভেতরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির কিছু সদস্যও এই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকই এই যুদ্ধ পছন্দ করছিলেন না, তবে কংগ্রেস সদস্যদের আশঙ্কা, যুদ্ধ থামানোর জন্য ট্রাম্প ইরানকে অনেক বেশি ছাড় দিয়ে ফেলেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি শুধু ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন।

কিন্তু ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে উল্টো দেশটির ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সমমূল্যের আটকে থাকা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা আলী খামেনি বলেন, “আমেরিকান পক্ষ যদি অতিরিক্ত কোনো দাবি করে, তবে আমরা তা মেনে নেব না।”

তিনি আরও মন্তব্য করেন, ট্রাম্প ‘হতাশা’ থেকে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন এবং একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আগামী দিনের আলোচনা খুব একটা সহজ হবে না। অথচ এই পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করাই ছিল যুদ্ধ শুরু করার পেছনে ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান অজুহাত।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দুই দেশের প্রতিনিধিদল ৬০ দিন সময় পাবে, তবে দুই পক্ষ সম্মত হলে এই সময়সীমা বাড়ানো যাবে। এ ছাড়া ইরানের জন্য তিন হাজার কোটি ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল এবং অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের বিষয়টি নিয়েও জোর চেষ্টা চালাবে। এদিকে যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ও এখন ওয়াশিংটনে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন সংবাদপত্র দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ দেশটির আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছে, যুদ্ধের খরচ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিল মেটাতে তাদের আরও আট হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন।

প্রায় চার মাস আগে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তখন ট্রাম্প বলেছিলেন যে তার লক্ষ্য ইরানের পরমাণু সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা।

এ ছাড়া তিনি প্রতিবেশীদের ওপর তেহরানের হামলা চালানোর ক্ষমতা বন্ধ করতে, এ অঞ্চলে ইসরায়েলবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের সমর্থন দেওয়া ঠেকাতে এবং ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে চেয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প যখন এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, তখন এর কোনো লক্ষ্যই পূরণ হয়নি।

চুক্তিতে ইরান শুধু কয়েক দশক ধরে চলে আসা তাদের পুরোনো দাবিরই পুনরাবৃত্তি করেছে যে তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক প্রেসিডেন্ট ইরানের এই দাবিকে সব সময়ই সন্দেহ করে এসেছেন।

চুক্তি অনুযায়ী, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিজস্ব গবেষণাগারেই ধ্বংস করতে এবং পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের নিয়মিত পরিদর্শনের সুযোগ দিতে রাজি হয়েছে।

তবে ইউরেনিয়ামের এই মজুত দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার যে দাবি ট্রাম্প করেছিলেন, ইরান তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই আলোচনা থেকে এখনো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি শক্তিশালী চুক্তি বেরিয়ে আসতে পারে।

২০১৫ সালে যে পরমাণু চুক্তি হয়েছিল এবং ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যা বাতিল করেছিলেন, নতুন চুক্তিটিকে তার চেয়েও উন্নত করাই এখন মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

কারণ তারা একটি পরাশক্তির আক্রমণ প্রতিহত করেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞা থেকে বড় ধরনের ছাড় আদায় করতে পেরেছে।

ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের অপর পাড়ে থাকা প্রতিবেশী দেশ ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে তারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রাখবে।

যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় এখন তারা চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে নতুন একধরনের সেবা মাশুল আদায়ের পরিকল্পনা করছে, তবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনার সময়ে এই মাশুল নেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার চালু হওয়ার পর তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর চলাচল শুরু হয়েছে।

ফলে বাজারে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি থাকায় আজ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমেছে, যেখানে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হতো। এদিকে লেবাননে ইসরায়েলি হামলার কারণে ইতিমধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ আজ লেবাননে ইসরায়েলের নতুন বিমান হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে।

এই হামলার পর ট্রাম্প তার মিত্র ইসরায়েলকে হামলা বন্ধ করতে কত দূর বাধ্য করতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

চুক্তিতে লেবাননে যুদ্ধের ‘স্থায়ী অবসান’-এর কথা বলা হলেও ইসরায়েল জানিয়েছে যে সেখান থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই। নজিরবিহীনভাবে তারা একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে তাদের দখলকৃত অঞ্চলের পরিধি বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।

লেবাননে ইসরায়েলের অভিযানের বিষয়ে ট্রাম্প এখন প্রকাশ্যেই সমালোচনা শুরু করেছেন, যার ফলে গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশ দুটির মধ্যকার সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ফাটল তৈরি হয়েছে।

এএন