যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে ৩০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। দক্ষিণ ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৩০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও আড়াই শতাধিক মানুষ। একই সঙ্গে মার্কিন হামলায় ইরানের ৭ জন সেনাসদস্যও নিহত হয়েছেন, যার জবাবে তেহরান তীব্র প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।

অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর অবিরাম হামলায় নিহতের মোট সংখ্যা এবার ৭৩ হাজার অতিক্রম করেছে। সব মিলিয়ে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন এক নজিরবিহীন ও অস্থিতিশীল যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে।

বেসামরিক ও সামরিক হতাহত

গত কয়েক দিন ধরে দক্ষিণ ইরানের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল লক্ষ্য করে দফায় দফায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জন সাধারণ বেসামরিক ইরানি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া মার্কিন বোমাবর্ষণে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ২৬০ জনেরও বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দক্ষিণ ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোই এখন মার্কিন আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ক্রমাগত বিমান ও নৌ-হামলার কারণে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড় বাড়ছে এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

বেসামরিক হতাহতের পাশাপাশি সামরিক ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে ইরান। মার্কিন সামরিক বাহিনী দক্ষিণ ইরানে একযোগে ১৩টি ক্ষেপণাস্ত্রের একটি শক্তিশালী ব্যারেজ নিক্ষেপ করে। এই বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বা সশস্ত্র বাহিনীর ৭ জন বীর সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন।

ইরানি সামরিক কমান্ড এই মার্কিন হামলাকে একটি 'কাপুরুষোচিত আগ্রাসন' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এক বিবৃতিতে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, সার্বভৌম দেশের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নগ্ন হামলা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। 

একই সঙ্গে তারা নিহত সেনাদের রক্তের বদলা নিতে এবং দেশের ভূখণ্ড রক্ষা করতে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর ও উপযুক্ত পাল্টা প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এই হুঁশিয়ারির পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তীব্র রূপ নিয়েছে।

নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার পার

এদিকে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের চালানো নিষ্ঠুর ও পদ্ধতিগত গণহত্যামূলক (জেনোসাইড) যুদ্ধ পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান এবং তথাকথিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তাদের বর্বর অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ দৈনিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে আরও ১২টি মরদেহ আনা হয়েছে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন গুরুতর আহত ব্যক্তি মারা গেছেন। এর ফলে কেবল গত একদিনেই নতুন করে ১৩ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু নথিভুক্ত করা হলো। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলের বিমান ও স্থল হামলায় আরও অন্তত ১৮ জন ফিলিস্তিনি নাগরিক গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানিয়েছে যে, গাজার প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, ইসরায়েলের অবিরাম বোমাবর্ষণ এবং বুলডোজারের ধ্বংসযজ্ঞের কারণে এখনও অসংখ্য মানুষের মরদেহ ধসে যাওয়া ঘরবাড়ি ও ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং দুর্গম সড়কগুলোতে চাপা পড়ে আছে। 

গাজার সিভিল ডিফেন্স এবং অ্যাম্বুলেন্স কর্মীরা উদ্ধারকারী যান ও জ্বালানির তীব্র সংকটের কারণে এবং ইসরায়েলি স্নাইপার ও ড্রোন হামলার ভয়ে সেসব স্থানে পৌঁছাতে পারছেন না। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের আশা যেমন শেষ হয়ে যাচ্ছে, তেমনি অনেক মরদেহ পচে গলে যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।

মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সামগ্রিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৭৩,২৪৬ জনে,। এছাড়া ইসরায়েলি বাহিনীর বোমাবর্ষণ ও বুলেটের আঘাতে এ পর্যন্ত আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ১৭৩,৭২৭ জনেরও বেশি, ফিলিস্তিনি। হতাহতদের সিংহভাগই নিরীহ নারী, শিশু এবং বৃদ্ধ। 

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রয়োজনীয় ওষুধ, অ্যানেস্থেশিয়া এবং অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতির অভাবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

ভেঙে পড়েছে তথাকথিত 'যুদ্ধবিরতি'

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে মূলত গত বছরের একটি ব্যর্থ শান্তি চুক্তির পর। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একটি তথাকথিত 'যুদ্ধবিরতি' ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, ইসরায়েল কখনোই সেই চুক্তিকে সম্মান দেখায়নি এবং যুদ্ধবিরতির আড়ালে তারা গাজায় তাদের সামরিক আগ্রাসন ও বেসামরিক এলাকা পুনর্দখলের প্রক্রিয়া চালু রেখেছিল।

সরকারি পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ দেয়। তথাকথিত ২০২৫ সালের অক্টোবরের সেই 'যুদ্ধবিরতি' ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় নতুন করে অন্তত ১,১২৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত, হয়েছেন এবং আরও ৩,৬১৬ জন ফিলিস্তিনি গুরুতরভাবে আহত, হয়েছেন। 

এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও বাস্তবে গাজার মাটিতে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলা জাতিগত নিধনযজ্ঞ এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি।
 আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে মধ্যপ্রাচ্য

দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ইরানের পাল্টা আঘাতের হুমকি- সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক মহাসংকটের মুখোমুখি। বিশ্ব রাজনীতি ও সামরিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি যেকোনো সময় একটি অনিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

বিশেষ করে ইরানপন্থী রাজনৈতিক ও সামরিক জোট বা তথাকথিত ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (Axis of Resistance) বর্তমানে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে। লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া এবং ইরাকে থাকা ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো এই পরিস্থিতিতে কী ভূমিকা নেবে, তা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে ইরানের এই অক্ষ বা নেটওয়ার্ক বর্তমানে কিছুটা বিশৃঙ্খল (Disarray) অবস্থায় রয়েছে।

একই সঙ্গে ভূ-রাজনীতিতে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে পারস্য উপসাগরীয় ধনী দেশগুলোর ভূমিকা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কাতারের মতো মধ্যপন্থী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো কি মার্কিন-ইরান এই সম্ভাব্য সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে, নাকি তারা নিরপেক্ষ থাকবে- তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। যদি উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন জোটের অংশ হিসেবে যুদ্ধে শরিক হয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার সম্পূর্ণ ধসে পড়বে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অবিলম্বে গাজা ও ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। জাতিসংঘ সহ বিশ্বনেতাদের কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে মার্কিন প্রশাসন ও ইসরায়েলের অনমনীয় মনোভাবের কারণে আপাতত শান্তির কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না।

এএন