তপ্ত বৈশাখে শরীর জুড়াবে যে ‘সুপারফুড’, গরমে সুস্থ থাকার আদ্যোপান্ত

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ০২:২৩ পিএম

সূর্য এখন মধ্যগগণে, চারদিকে বইছে তপ্ত লু হাওয়া। তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন শুধু তৃষ্ণা মেটানোই যথেষ্ট নয়, বরং শরীরকে ভেতর থেকে শীতল ও সতেজ রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রচণ্ড গরমে পানিশূন্যতা, পেটের পীড়া আর হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি। 

প্রকৃতি এই সময়ে আমাদের এমন সব ফল ও সবজি দিয়েছে যা শরীরকে ঠান্ডা রাখতে প্রাকৃতিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির মতো কাজ করে। আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরব গরমে সুস্থ থাকার সেরা সব পানীয় ও খাবারের তালিকা।

তীব্র গরমে শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে প্রচুর খনিজ লবণ বেরিয়ে যায়। এটি পূরণ করতে কেবল সাধারণ পানি যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন কমপক্ষে ২.৫ থেকে ৩.৫ লিটার পানি পান করা উচিত। তবে পানির সাথে কিছু প্রাকৃতিক পানীয় যোগ করলে শরীর দ্রুত চাঙা হয়। পটাশিয়াম ও ইলেকট্রোলাইটের খনি হলো ডাবের পানি। এটি শরীরের পানিশূন্যতা নিমিষেই দূর করে। 

অন্যদিকে, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ লেবুর শরবত শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায়। বেলের শরবত কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে পেট ঠান্ডা রাখে। আখের রস ও মাঠা বা বাটার মিল্ক ক্লান্তি দূর করতে অতুলনীয়। দইয়ের লচ্ছি বা ঘোল প্রোবায়োটিক হিসেবে কাজ করে, যা হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে।

গরমের এই মৌসুমে প্রকৃতি আমাদের উপহার দিয়েছে প্রচুর পানিযুক্ত ফল। এসব ফলে ৯০ শতাংশের বেশি পানি থাকে যা আমাদের আর্দ্র বা হাইড্রেটেড রাখে। তরমুজ আর বাঙ্গি হলো গরমের শ্রেষ্ঠ ফল। এতে থাকা লাইকোপেন এবং পানি শরীরকে আর্দ্র রাখে। এছাড়া কাঁচা আম দিয়ে বানানো জুস বা আমপোড়া শরবত হিটস্ট্রোক প্রতিরোধে দারুণ কার্যকর। আনারস, পেয়ারা ও জামরুল শরীরকে ভেতর থেকে শীতল রাখে।

লাউ, ঝিঙে, পটোল, ধুন্দল আর চিচিঙ্গা, এই সবজিগুলো এখনকার বাজারের প্রাণ। এগুলোতে ক্যালোরি কম কিন্তু পানির পরিমাণ অনেক বেশি। শসা ও টমেটো সালাদ হিসেবে খেলে শরীরে পানির অভাব হয় না। করলা বা তিতা স্বাদের সবজি শরীরকে বিষমুক্ত বা ডিটক্স করতে এবং রক্ত পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।

গরমকালে পেটের সমস্যা বা বদহজম খুব সাধারণ বিষয়। এটি এড়াতে টক দই অন্যতম সেরা খাবার। দইয়ে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় এবং পেট ঠান্ডা রাখে। এছাড়া চিয়া সিড বা ইসবগুলের ভুষি ভেজানো পানি খেলে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। পুদিনা পাতা ও মৌরি ভেজানো পানি শরীরকে সতেজ রাখে এবং অতিরিক্ত ঘাম রোধ করে।

সুস্থ থাকতে হলে কী খাচ্ছেন তার চেয়েও জরুরি কী বর্জন করছেন। গরমে কিছু খাবার শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং পানিশূন্যতা তৈরি করে। অতিরিক্ত চা কফি বা সোডা পান করলে প্রস্রাব বেশি হয়, যা শরীরকে দ্রুত পানিশূন্য করে ফেলে। অতিরিক্ত তেল মশলাযুক্ত খাবার হজম করা কঠিন। এটি শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া বা মেটাবলিজম বাড়িয়ে তাপ তৈরি করে, ফলে অস্থিরতা বাড়ে। গরমের সময় খাবারে দ্রুত ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। রাস্তার খোলা শরবত বা কাটা ফল টাইফয়েড ও জন্ডিসের কারণ হতে পারে।

অতিরিক্ত গরমে প্রস্রাবে সংক্রমণ বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এটি রোধ করতে প্রচুর পানি পান করার পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় রসুন, মধু ও দারুচিনি রাখতে পারেন। এগুলোর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণাগুণ শরীরকে জীবাণু থেকে রক্ষা করে। কাঁচা পেঁপে ও আদা হজমশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

একবারে পেট ভরে ভারি খাবার না খেয়ে অল্প পরিমাণে বারবার স্বাস্থ্যকর খাবার খান। এতে পাকস্থলীর ওপর চাপ কম পড়ে। সবসময় ঘরে তৈরি তাজা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। বাসি খাবার এই গরমে দ্রুত নষ্ট হয়ে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। খাবার দাবারের পাশাপাশি সুতির হালকা রঙের পোশাক এবং বাইরে বের হলে ছাতা বা চশমা ব্যবহার করুন। গরমের তীব্রতা থেকে রক্ষা পাওয়ার চাবিকাঠি আপনার রান্নাঘরেই আছে। সঠিক খাবার নির্বাচন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার মাধ্যমেই এই দুঃসহ দাবদাহে সুস্থ থাকা সম্ভব। 

মনে রাখবেন, শরীর যদি ভেতর থেকে ঠান্ডা থাকে, তবে বাইরের খরতাপ আপনাকে কাবু করতে পারবে না। আসুন, প্রাকৃতিক খাবার ও সচেতনতার মাধ্যমে এই গ্রীষ্মকে উপভোগ্য করে তুলি। আপনার সুস্থতা আমাদের কাম্য। আজ থেকেই খাদ্যতালিকায় যোগ করুন প্রচুর পানি ও রসালো ফল।

জেএইচআর