বাংলাদেশে প্রোটিনের অন্যতম সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী উৎস হলো ব্রয়লার বা ফার্মের মুরগি। তবে এটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক ও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকের প্রশ্ন- ব্রয়লার মুরগি নিয়মিত খাওয়া কি স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর নির্ভর করে মুরগি কীভাবে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও রান্না করা হচ্ছে তার ওপর।
দেশের অধিকাংশ পরিবারের খাদ্যতালিকায় নিয়মিত স্থান করে নিয়েছে ব্রয়লার মুরগি। তুলনামূলক কম দামে সহজে পাওয়া যায় বলে এটি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়। তবে বাজারে নানা গুজব ও প্রচলিত ধারণার কারণে অনেকেই এই মুরগির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
চিকিৎসক ডা. শাহানাজের মতে, ব্রয়লার মুরগি নিজে কোনোভাবেই ক্ষতিকর খাদ্য নয়। বরং এটি উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন বি-৬ এবং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খনিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে এর নিরাপত্তা নির্ভর করে খামারে লালন-পালনের পদ্ধতি, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নিয়ম মেনে চলা এবং জবাই ও সংরক্ষণের সময় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে।
তিনি বলেন, অনেক খামারে রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ না করে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হলে কিংবা জবাইয়ের আগে নির্ধারিত অপেক্ষার সময় মানা না হলে মাংসে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ব্রয়লার মুরগি নিয়ে আরেকটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো, দ্রুত বড় করার জন্য এতে হরমোন ব্যবহার করা হয়। তবে ডা. শাহানাজ বলেন, এ দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বর্তমানে উন্নত জাত নির্বাচন, সুষম খাদ্য এবং আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনার কারণেই ব্রয়লার মুরগি দ্রুত বেড়ে ওঠে।
তিনি আরও জানান, খামারে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করা হলে কিংবা জবাই, পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় অসতর্কতা থাকলে সালমোনেলা ও ক্যাম্পিলোব্যাক্টারের মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মাংসে থাকতে পারে। তাই মুরগির মাংস অবশ্যই ভালোভাবে সিদ্ধ বা রান্না করে খাওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিকভাবে উৎপাদিত ব্রয়লার মুরগি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় লিন প্রোটিনের একটি উৎকৃষ্ট উৎস। এছাড়া এতে ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন বি-৬, নিয়াসিন (ভিটামিন বি-৩), ফসফরাস, সেলেনিয়াম এবং জিংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ডা. শাহানাজের ভাষ্য, চামড়াবিহীন ব্রয়লার মুরগির মাংস পরিমিত পরিমাণে নিয়মিত খাওয়া একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। দেশি মুরগি ও ব্রয়লার- উভয়ই ভালো মানের প্রোটিন সরবরাহ করে। দেশি মুরগির স্বাদ ও গঠন ভিন্ন হলেও পুষ্টিগুণের দিক থেকে বড় ধরনের পার্থক্য নেই। বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মুরগির গুণগত মান, নিরাপদ উৎপাদন এবং স্বাস্থ্যসম্মত রান্না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নিরাপদে ব্রয়লার মুরগি খাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, বিশ্বস্ত দোকান বা অনুমোদিত খামার থেকে মুরগি কেনা উচিত। দুর্গন্ধযুক্ত বা অস্বাভাবিক রঙের মাংস এড়িয়ে চলতে হবে। কাঁচা ও রান্না করা মাংস আলাদা করে সংরক্ষণ করতে হবে এবং মাংস সম্পূর্ণভাবে সিদ্ধ বা ভালোভাবে রান্না করে তবেই খেতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যথাযথ নিয়ম মেনে উৎপাদিত, নিরাপদভাবে সংরক্ষিত এবং ভালোভাবে রান্না করা ব্রয়লার মুরগি সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার। তাই প্রচলিত ভুল ধারণা বা গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে সচেতনভাবে বিশ্বস্ত উৎস থেকে মুরগি কিনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত।
এএন