পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ: একটি ত্রিমাত্রিক বিশ্লেষণ

শামসুল আলম প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৭, ২০২৫, ০৩:০৪ পিএম

পাক-ভারত যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ৩ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকে জানান, শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনই নয়, বরং ভারতের উদ্দেশ্য হচ্ছে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের গুরুত্বপূর্ণ এক অংশের দখল নেয়া এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়া, যাতে পাকিস্তান ভবিষ্যতে আর কখনো ভারতকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, নৈতিক অথবা আদর্শিক অনুপ্রেরণায় ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সাহায্য ও সমর্থন দেয়ার চেয়ে বরং কাশ্মীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করা এবং পাকিস্তান ভেঙে দেয়াই ছিল ইন্দিরা গান্ধীর প্রধান উদ্দেশ্য। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ তাতে ছিল একটি গৌণ পার্শ্ব ফলশ্রুত মাত্র বা সেকেন্ডারি বাই প্রোডাক্ট, অনুপ ধরের এ উক্তির যথার্থতা প্রতীয়মাণ হয়। তবে ঐ কেবিনেট সভায় ইন্দিরা গান্ধীর আরেকটি বাক্য ছিল, যে সুযোগের জন্য ভারত পঁচিশ বছর ধরে অপেক্ষা করছে, তা হেলায় হারাতে পারে না। ভারতের দু’দিকে পাকিস্তান বেষ্টিত হওয়ায় এর প্রতিরক্ষা আয়োজন ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ব্যয়বহুল। 

বিশেষ করে, এক দশক ধরে ভারতের পূর্বাঞ্চলের নাগা ও মিজো বিদ্রোহীদের পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় দান, ট্রেনিং ও অস্ত্রশস্ত্র প্রদান করে আসছে এমন অভিযোগ ভারতের। আর তা বন্ধ করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার এটাই ছিল সর্বোত্তম সুযোগ।

৩ ডিসেম্বর ভারত সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়ানোর ৫ দিনের মধ্যেই বিমান বাহিনীর সহায়তায় পশ্চিম, পূর্ব ও উত্তর দিক দিয়ে ভারতীয় স্থলবাহিনী প্রবেশ করে পূর্ববাংলায়। মিত্রবাহিনীর দ্রুত ও সাঁড়াশি আক্রমণে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই পাকিস্তানের পূর্ব কমান্ড পরাজয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার্থে জাতিসংঘে যুদ্ধ বিরতির মার্কিনী জোর প্রয়াস চলতে থাকে, যা সোভিয়েত বিরোধিতায় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন হট লাইনে পারমাণবিক শক্তি প্রয়োগের হুমকির কথা সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভকে জানিয়েও যুদ্ধ বন্ধ করতে ব্যর্থ হন। ৬ ডিসেম্বর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের মাধ্যমে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ মুক্ত করার কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে। 

এ সময়, পূর্ব পাকিস্তানে শোচনীয় সামরিক পরিস্থিতি এড়াতে ইয়াহিয়া খান বেসামরিক প্রতিনিধিদের হাতে শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের অযুহাতে নতুন খেলা শুরু করেন। ৮ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান থেকে নূরুল আমিনকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে উপপ্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন।

অন্যদিকে ১১ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশ যৌথ কমান্ড ঘোষণা করেন ইন্দিরা গান্ধী। পাকিস্তান রক্ষায় মার্কিন কূটনৈতিক প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষিতে বাধ্য হয়ে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ইয়াহিয়ার সাহায্যার্থে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরের দিকে প্রেরণের নির্দেশ দেন। পূর্ব ফ্রন্টের পাক বাহিনী প্রধান জেনারেল নিয়াজীর আশা ছিল, উত্তর দিক থেকে চীনা বাহিনী এবং দক্ষিণ দিক থেকে মার্কিন নৌ আক্রমণে ভারতকে ঘিরে ফেলা হবে, যাতে করে ভারত সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। 

তবে চীনা সহায়তা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ব্যক্তিগত প্রতিনিধি জুলফিকার আলী ভুট্টোর চীনে কূটনৈতিক মিশন ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও বিষয়টি গোপন রাখা হয়। বাস্তবে, ভারত সোভিয়েত মৈত্রীচুক্তির প্রভাব ও সোভিয়েত চীন সীমান্তে উসূরী নদী বরাবর চল্লিশ ডিভিশন সৈন্য এবং সিংকিয়াং সীমান্ত বরাবর আরও ৬ থেকে ৭ ডিভিশন সোভিয়েত সৈন্যের উপস্থিতি প্রভৃতি বিষয় বিবেচনা করে চীন অবশেষে ভারত অভিযানে আর উদ্যোগী হয়নি।

পূর্ব পাকিস্তানে সম্ভাব্য মার্কিন অভিযান রোধ করতে আগেই সোভিয়েত সাবমেরিনসহ মোট ষোলটি যুদ্ধজাহাজ ও সরবরাহ জাহাজ বঙ্গোপসাগরে বা তার আশেপাশে সমবেত করা হয়। 

প্রশান্ত মহাসাগর থেকে মার্কিন রণতরী সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে পৌঁছার প্রয়োজনীয় ৪ থেকে ৫ দিন সময়ের আগেই ভারতীয় বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যাপকভাবে বিমান হামলা চালায়। ১৪ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভা চলাকালে ঢাকায় গভর্নর হাউজে ভারতীয় বিমান হামলা চালায়, ফলে পদত্যাগ করে মালেক মন্ত্রিসভা। গভর্নর ভবন ছাড়াও এদিন ঢাকার সামরিক লক্ষ্যবস্তুসমূহের উপর ভারতীয় বিমান আক্রমণ অব্যাহত থাকে।

যশোর, কুমিল্লা, সিলেট ও উত্তরবঙ্গে এক এক করে নিয়াজীর দুর্গ যখন পতন হচ্ছিল, তখনও রাওয়ালপিন্ডির সামরিক কর্তারা নিয়াজীর মনোবল ধরে রাখার জন্য চীনের তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে ফাঁকা আওয়াজ জারি রাখে। কিন্তু বাস্তব সাহায্য আসার কোনো লক্ষণ তখনও দৃশ্যমান হয়নি।

চীনের কাঙ্ক্ষিত ভারত অভিযানের জবাবে সোভিয়েত রাশিয়া যদি চীন আক্রমণ করে, তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে, এমন আশ্বাসের পরেও চীনারা সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধ এড়াতে ইয়াহিয়ার সহায়তায় সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসা থেকে বিরত থাকে।

অন্যদিকে ভারতের টার্গেট ছিল মার্কিন ও চীনা সাহায্য পৌঁছার আগেই পাক বাহিনীকে পরাভূত করা। এই লক্ষে ৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভারতের সরকারি মাধ্যম থেকে ঘোষণা করা হয়, পাকিস্তান যদি পূর্ব বাংলায় তাদের পরাজয় স্বীকার করে নেয়, তবে সকল ফ্রন্টেই যুদ্ধ বন্ধ করবে ভারত। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো ভূখণ্ড দখল করার অভিপ্রায় ভারতের নেই।

অতঃপর ভারতীয় কমান্ড এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে পাক বাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য ১৪ তারিখ পর্যন্ত আল্টিমেটাম প্রয়োগ করে, যদিও ঢাকার চূড়ান্ত পতনের জন্য ভারতের প্রয়োজনীয় ট্যাংক বাহিনী ছিল মেঘনার ওপারে। অন্যদিকে, পশ্চিম ফ্রন্টেও পাক বাহিনী সুবিধা করতে না পেরে ক্রমান্বয়ে পশ্চাদপসরণ করতে থাকে। পশ্চিম ফ্রন্টে রাজস্থান সিন্ধু সীমান্তের যুদ্ধে এগিয়ে থাকে ভারত, করাচীর উপর ভারতীয় নৌ ও বিমান আক্রমণ অব্যাহত থাকে। 

এ অবস্থায়, পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ড রক্ষার জন্য ভারতের প্রস্তাবিত আত্মসমর্পণের প্রস্তাবে সাড়া দিতে রাজি হন ইয়াহিয়া। ১৪ ডিসেম্বর ইয়াহিয়া খান পূর্ব কমান্ডকে পরিষ্কার নির্দেশ দেন আত্মসমর্পণের জন্য। কিন্তু নিয়াজী শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। বিপদাপন্ন পশ্চিম পাকিস্তানকে রক্ষা করতে ভারতের কাছে পূর্ব কমান্ডকে অস্ত্রসমর্পণে ইয়াহিয়ার আগের নির্দেশ প্রতিপালনের জন্য ১৫ ডিসেম্বর সেনাপ্রধান জেনারেল হামিদ এবং এয়ার চীফ মার্শাল রহিম টেলিফোন করে জেনারেল নিয়াজীকে পুননির্দেশ দেন।

নিয়াজী তার জীবনের শেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পাক হাইকমান্ডের গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পূর্ব কমান্ডের সাথে প্রতারণা করেছিল, কূট কৌশলের আশ্রয় নিয়ে পূর্ব কমান্ডকে ভুল পথে পরিচালিত করেছিল এবং একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পূর্বাংশকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল। 

বাস্তবে, রণাঙ্গনের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে পিন্ডির কাছে সঠিক খবর ছিল না, অধিকন্তু নিয়াজিকে ভুয়া বৈদেশিক সাহায্যের আশ্বাস দেয়া হয়। অধিকন্তু, বিরূপ প্রকৃতি ও বৈরী জনগণের মধ্যে ন’মাস ব্যাপী অন্যায্য যুদ্ধে দখলদার বাহিনী ছিল পরিশ্রান্ত এবং মনোবল ভাঙা। বাস্তবিক অর্থে, বৈদেশিক সহায়তার উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে ইয়াহিয়ার বাহিনী মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে একাকী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আত্মশক্তি হারিয়ে ফেলে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই, পাকিস্তানী জওয়ান ও অফিসারদের উদ্দেশ্যে আত্মসমর্পণের জন্য ভারতের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেক শ’র মনস্তাত্ত্বিক চাপ আকাশবাণী থেকে প্রচারিত হতে থাকে।

মার্কিন চীনের সক্রিয় অংশগ্রহণ হলে মহাদেশীয় যুদ্ধ বিস্তারের আশঙ্কা ছিল, এমনকি মার্কিন সপ্তম নৌবহরের সম্ভাব্য হামলার হুমকির মুখেও ভারতীয় বাহিনী তড়িৎ ব্যাপক আক্রমণের পাশাপাশি প্রচারণা যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সাফল্য লাভ করে। যার ফলে, পূর্ব পাকিস্তান ভূখণ্ডে প্রায় লক্ষাধিক সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও রাজধানী ঢাকা রক্ষার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াই ভারতীয় বাহিনীর আত্মসমর্পণের আল্টিমেটামে সাড়া দেয় পাক ইস্টার্ন কমান্ড। মূলত ১১ ডিসেম্বরের মধ্যেই যুদ্ধ পাকিস্তানের হাতছাড়া হয়ে যায়। 

ফলশ্রুতিতে, ১৬ ডিসেম্বর বিকাল সাড়ে ৪ টায় ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ভারতীয় জেনারেল অরোরার কাছে নিয়াজীর বাহিনী আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটে, যেখানে যৌথ কমান্ডের বাংলাদেশ অংশকে অনুপস্থিত রাখা হয় অত্যন্ত সচেতন ভাবে। আর এভাবেই জন্ম লাভ করে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ, যা ন’মাস আগে ঘোষিত হয়েছিল কালুরঘাটের একটি ছোট্ট বেতারকেন্দ্র থেকে। এই আত্মসমর্পণকে পাকিস্তানের ওপর ভারতের যুদ্ধজয় হিসাবে নিশ্চিত করতে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মিত্রবাহিনীর বাংলাদেশ প্রধান জেনারেল ওসমানী যাতে উপস্থিত থাকতে না পারেন, সেজন্য ঢাকায় আসা আটকে দেয়া হয়েছিল। 

যার স্বীকৃতি মিলে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের প্রথম রাষ্ট্রদূত জেএন দীক্ষিত তার ইন্ডিয়া পাকিস্তান ইন ওয়ার এন্ড পীস পুস্তকে, জেনারেল ওসমানীর অনুপস্থিতি সম্পর্কে লিখেছেন যে তার হেলিকপ্টারটি ভুল পথে পাঠানো হয়েছিল যাতে তিনি সময়মতো ঢাকায় পৌঁছাতে না পারেন এবং অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে ভারতের সামরিক কমান্ডাররা থাকতে পারেন। মইদুল হাসানের ভাষায়, ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল মানেক শ বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার আগেই পাক বাহিনীকে বরং ভারতীয় বাহিনীর কাছে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ করানোর চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে উঠেন।

স্বৈরাচার মুক্ত বাংলাদেশে সবাইকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।

লেখক: বাংলাদেশ সরকারের সিনিয়র সচিব ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক স্টাফ অফিসার।

ইএইচ