বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাহেন্দ্রক্ষণ ঘনিয়ে এসেছে। দেশের মানুষের দৃষ্টি এখন শেরে বাংলা নগরের সেই লাল ইটের স্থাপত্য, জাতীয় সংসদ ভবনের দিকে। আগামী ৭ জুন থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘বাজেট অধিবেশন’। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী ৭ জুন (রবিবার) বিকেল ৩টায় অধিবেশন শুরু হবে।
সংবিধানের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতির আদেশ
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাকে প্রয়োগ করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এই অধিবেশন আহ্বান করেছেন। সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ অধিশাখা ২ এর পরিচালক (গণসংযোগ) সাইদুজ্জামান সাঈদের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির এই আদেশের পর সংসদীয় রীতি অনুযায়ী অধিবেশন পরিচালনার জন্য যাবতীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে সংসদ সচিবালয়।
ইতিমধ্যেই সংসদ সচিবালয়ের উপসচিব শওকত আকবর বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়কে (বিজিবি) এই সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশের জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছেন। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যম, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে এই তথ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট: আগামীর রূপরেখা
এই অধিবেশনটি মূলত ‘বাজেট অধিবেশন’ হিসেবেই পরিচিত। প্রতি বছর জুন মাসে দেশের আয়-ব্যয়ের খতিয়ান বা জাতীয় বাজেট পেশ করার জন্য এই দীর্ঘমেয়াদী অধিবেশন বসে। এবারের অধিবেশনটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করা হবে।
বর্তমান সরকারের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই বাজেটে মেগা প্রকল্প এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বরাদ্দ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটে কী ধরনের কৌশল নেওয়া হয়, সেদিকে নজর থাকবে সাধারণ মানুষের। অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী কর্তৃক বাজেট উপস্থাপনের পর সংসদ সদস্যরা এর ওপর বিস্তারিত ও চুলচেরা আলোচনা করবেন। পরবর্তীতে অর্থ বিল পাসের মাধ্যমে আগামী অর্থবছরের বরাদ্দ অনুমোদিত হবে।
প্রস্তুতিতে সংসদ সচিবালয়
রাষ্ট্রপতির আহ্বানের পরপরই শেরে বাংলা নগরের সংসদ ভবনের অন্দরে সাজসাজ রব শুরু হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার এই অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, আসন বিন্যাস এবং ডিজিটাল উপস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ত্রুটি মেরামতের কাজ চলছে। সংসদীয় লবি থেকে শুরু করে ক্যাফেটেরিয়া, সবখানেই প্রস্তুতির আমেজ।
বাজেট অধিবেশন সাধারণত দীর্ঘ হয়ে থাকে। এতে বাজেটের পাশাপাশি সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সংসদীয় বিতর্কের সুযোগ থাকে। সাধারণ মানুষ আশা করছেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি জনকল্যাণমুখী বাজেট এই অধিবেশনে পাস হবে।
প্রথম অধিবেশনের সাফল্য ও প্রেক্ষাপট
এর আগে গত ৩০ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সমাপ্ত হয়েছে। প্রথম অধিবেশনে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লক্ষ্য করা গেছে। সংসদ সচিবালয়ের তথ্যমতে, প্রথম অধিবেশনে মোট ৯৪টি বিল পাস হয়েছে এবং ১৩৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। নজিরবিহীন এই কর্মচাঞ্চল্য নির্দেশ করে যে, ত্রয়োদশ সংসদ আইন প্রণয়ন ও সংসদীয় বিতর্কে অত্যন্ত সক্রিয়।
প্রথম অধিবেশনের রেশ কাটতে না কাটতেই বাজেট অধিবেশনের ডাক আসা সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতারই বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের গঠনমূলক অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাজেট আলোচনা একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
জননিরাপত্তা ও অন্যান্য নির্দেশনা
বাজেট অধিবেশন চলাকালীন সংসদ ভবনের আশেপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে সংসদ ভবন ও এর আশেপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে শীঘ্রই প্রজ্ঞাপন জারি করার কথা রয়েছে। এছাড়া বাজেট বক্তৃতার কপি এবং ডিজিটাল নথি সংসদ সদস্যদের সঠিক সময়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগও কাজ করছে।
একটি সমৃদ্ধ আগামীর প্রত্যাশা
৭ জুনের এই অধিবেশনটি কেবল একটি রুটিন মাফিক সংসদীয় বৈঠক নয়, বরং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাংলাদেশের অর্থনীতির মানচিত্র। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থান খাতের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনবে, তা নির্ধারিত হবে এই অধিবেশনের কক্ষেই।
দেশের ব্যবসায়ী মহল, চাকরিজীবী, কৃষক এবং শিক্ষার্থীরা সাগ্রহে অপেক্ষা করছেন অর্থমন্ত্রীর সেই বাজেট বক্তৃতার জন্য। ৭ জুন রবিবার বিকেল ৩টায় যখন স্পিকারের হাতুড়ির শব্দে অধিবেশন শুরু হবে, তখন শুরু হবে বাংলাদেশের নতুন এক অর্থনৈতিক যাত্রার লড়াই।
এম জি