ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই আসনের প্রধান দুই প্রার্থী বিএনপির শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও জামায়াতের রেজাউল করিমের সম্পদ ও আয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে।
হলফনামায় দেওয়া তথ্যমতে, বিএনপির প্রার্থী দলের যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির বার্ষিক আয় ৪৭ লাখ ৩৬ হাজার ৫৪ টাকা, যা প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী রেজাউল করিমের তুলনায় প্রায় ৭ গুণ বেশি। এ্যানি হলফনামায় নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে জামায়াতের রেজাউল করিম বার্ষিক আয় তুলে ধরেছেন ৭ লাখ টাকা; তিনি সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। এদিকে এ্যানির সম্পদ ৩ কোটি ৯০ লাখ ৩১ হাজার ৬৭ টাকা এবং রেজাউলের সম্পদ ১১ লাখ ৬৩ হাজার ৩৯ টাকা। রেজাউলের তুলনায় এ্যানির সম্পদ প্রায় ৩৩ গুণ বেশি।
শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের সাবেক দু’বারের সংসদ সদস্য, বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। তিনি লক্ষ্মীপুর পৌরসভার সমসেরাবাদ এলাকার মৃত বশির উল্লাহ চৌধুরীর ছেলে। তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। এ্যানির দুই ছেলে ও এক মেয়ে; তারা সবাই শিক্ষার্থী।
রেজাউল করিম ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি। তিনি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর জয়পুর ইউনিয়নের প্রাণভগবতীপুর গ্রামের হোছাইন আহমদের ছেলে। পেশায় তিনি একজন সাংবাদিক ও লেখক। তাঁর এক ছেলে ও দুই মেয়ে; তাঁরা তিনজনই শিক্ষার্থী।
শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির হলফনামা
এ্যানির হলফনামা ঘেঁটে জানা যায়, তার নামে ৬০টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন।
এ ছাড়া কয়েকটি মামলায় তাকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে, হাইকোর্টের নির্দেশে কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে ও কয়েকটি মামলা বিচারাধীন। দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়েরকৃত গায়েবি মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে নাম থাকতে পারে, তবে সে রকম তথ্য তাঁর জানা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হলফনামায় এ্যানির অস্থাবর সম্পদে উল্লেখ করা হয়, মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন এ্যানি চৌধুরীর কাছে ৯৬ হাজার ৭৮১ টাকা ছিল। স্ত্রীর কাছে ছিল ১ লাখ ৩২ হাজার ২০৯ টাকা।
এ্যানির ঢাকা ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩০ লাখ ৮৫ হাজার ৫১৯ টাকা, এনসিসি ব্যাংক (ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রি রয়্যাল প্রোপার্টিজ) হিসাবে প্রায় ১১ লাখ ৫১ হাজার ১৬১ টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংক (ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান চৌধুরী এসএস কোম্পানি) হিসাবে প্রায় ৩ কোটি ৬১ লাখ ৬৩০ টাকা এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ব্যক্তিগত হিসাবে ২৯ হাজার ৪৭৪ ও অগ্রণী ব্যাংকে ২০ লাখ টাকা রয়েছে।
এ ছাড়া রাইট গার্মেন্টস লিমিটেডে ৯০ হাজার টাকা, টিপ্পানি মার্বেল বিডি লিমিটেডে ২ লাখ টাকা ও এগ্রো এনার্জি (প্রা.) লিমিটেডে ৫ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে। তার নিজের মালিকানাধীন বিজনেস ক্যাপিটেলে ৩১ লাখ ৩১ হাজার ৪১০ টাকা রয়েছে। এ্যানি চৌধুরীর প্রায় ৬১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা মূল্যের একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার স্টেশন ওয়াগন জিএক্স গাড়ি রয়েছে। বিবাহকালীন উপহার হিসেবে প্রাপ্ত প্রায় ১২০ তোলা স্বর্ণ আছে এবং স্ত্রীর রয়েছে ৩০ তোলা স্বর্ণ।
এ ছাড়া ১ লাখ টাকার ইলেকট্রিক পণ্য ও ২ লাখ টাকার আসবাবপত্র রয়েছে। তিনি ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা আর্থিক ঋণ প্রদান করেছেন। তিনি ১০ লাখ টাকা দিয়ে বোট ক্লাবের ও ১ লাখ টাকা দিয়ে নোয়াখালী ক্লাবের মেম্বারশিপ গ্রহণ করেন। উল্লিখিত সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ ২৭ হাজার ৫৭১ টাকা, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি ৩৬ লাখ ৪৫ হাজার ৫৭১ টাকা।
স্থাবর সম্পত্তিতে উল্লেখ করা হয়, এ্যানি চৌধুরীর প্রায় ৪০ লাখ টাকার জমি রয়েছে। লক্ষ্মীপুরে পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত প্রায় ১২৭ শতাংশ জমি রয়েছে। তাঁর নামে রাজধানীর বনানী মডেল টাউনে ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ৫ কাঠা জমি এবং তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের ৫ কাঠা জমি আছে।
লক্ষ্মীপুরে নির্মাণাধীন একটি আবাসিক ভবনের ১/৬ অংশ মালিকানা (মূল্য ৯ লাখ ১৬ হাজার ১৮৯ টাকা) রয়েছে। তেজগাঁও বাণিজ্যিক এলাকায় ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা মূল্যের ৩৬০০ স্কয়ার ফুটের একটি গোডাউন রয়েছে। ১ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিনিয়োগ রয়েছে বাকুশা হকার্স মার্কেট সমবায় সমিতিতে। উল্লিখিত সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য ১ কোটি ৪২ লাখ ৩৯ হাজার ৫৯৯ টাকা।
হলফনামায় দায়ের বিবরণে উল্লেখ করা হয়, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ব্যক্তিগত দুটি হিসাবের ক্রেডিট কার্ডের ২৪ হাজার ৪১২ টাকা, ব্যক্তিগত ঋণ ৩০ লাখ টাকা এবং জমি ও গোডাউন ভাড়া থেকে ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা দায় রয়েছে। স্ত্রীর নামে ১ কোটি ৯৮ লাখ ৩৬ হাজার ২০৮ টাকা ব্যবসায়িক ও ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৮ টাকা কার লোন রয়েছে। তাঁর মার্কেন্টাইল ব্যাংকের দুটি হিসাবে ২ লাখ ২৭ হাজার ২৮২ টাকা দায় রয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত ঋণ রয়েছে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং জমি বিক্রির অগ্রিম ১ কোটি টাকা দায় রয়েছে।
এ্যানি চৌধুরীর স্থাবর সম্পত্তি থেকে বছরে ৩০ লাখ ৫৫ হাজার ৮১০ টাকা, ব্যবসা থেকে ১৬ লাখ ৬৩ হাজার ৬৫২ টাকা, ব্যাংক আমানত ১৬ হাজার ৫৯২ টাকা এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি বিক্রি থেকে আয় ৩৫ লাখ ৯২ হাজার ৬৫৪ টাকা। তাঁর সম্পদে পরিমাণ ৩ কোটি ৯০ লাখ ৩১ হাজার ৬৭ টাকা এবং বছরে আয় ৪৭ লাখ ৩৬ হাজার ৫৪ টাকা। তিনি সবশেষ ৯ লাখ ৮৬ হাজার ৫৮ টাকা এবং তার স্ত্রী ৩ লাখ ২০ হাজার ৩৪২ টাকা আয়কর দিয়েছেন।
রেজাউল করিমের হলফনামা
রেজাউল করিমের হলফনামায় উল্লেখ করা হয়, তার বিরুদ্ধে ৮টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া ৭২টি মামলা থেকে তিনি খালাস ও অব্যাহতি পেয়েছেন। তিনি পেশায় সাংবাদিক ও লেখক। মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন তাঁর কাছে নগদ ৩ লাখ ২৯ হাজার ২৯৮ টাকা ছিল। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাঁর ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪১ টাকা রয়েছে। বন্ড, ঋণপত্র ও স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির শেয়ারে তার ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা আছে।
স্বর্ণসহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর তৈরি ২৫ ভরি ওজনের গহনা রয়েছে। তাঁর ৫০ হাজার টাকার ইলেকট্রিক পণ্য ও ৬০ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্র আছে। এসব সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য ১১ লাখ ৬৩ হাজার ৩৯ টাকা এবং বর্তমান মূল্য ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৩৯ টাকা।
ইএইচ