সব প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে আজ। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়াম আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে কিছুক্ষণ পরই শুরু হতে যাচ্ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ফাইনাল। শিরোপার শেষ লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে এশিয়ার পরাশক্তি ভারত এবং কিউই বাহিনী নিউজিল্যান্ড।
একদিকে ভারতের তারকাসমৃদ্ধ শক্তিশালী লাইনআপ, অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের হিসেবি ও সুশৃঙ্খল ক্রিকেট সব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী।
এই বিশ্বকাপে ভারত খেলছে এক অপ্রতিরোধ্য ছন্দে। সেমিফাইনালে জাসপ্রিত বুমরাহর সেই বিধ্বংসী স্পেল এখনো ভক্তদের চোখে ভাসছে। আহমেদাবাদের গতিময় পিচে বুমরাহ এবং অর্শদীপ সিং শুরুতে নিউজিল্যান্ডকে চেপে ধরবেন, এটাই ভারতের প্রধান কৌশল।
ব্যাটিংয়ে অধিনায়ক সুরিয়াকুমার ইয়াদাভ আছেন দুর্দান্ত ফর্মে। মাঝের ওভারে তার চার-ছক্কার ফুলঝুরি যেকোনো বোলিং আক্রমণকে তছনছ করে দিতে পারে। সাথে হার্দিক পান্ডিয়া ও সঞ্জু স্যামসনের ফিনিশিং দক্ষতা ভারতকে ফাইনালে ফেভারিট হিসেবে এগিয়ে রাখছে।
ফাইনালের আগে ভারতের অন্দরমহলে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তরুণ ওপেনার অভিষেক শর্মার ফর্ম। পুরো টুর্নামেন্টে সাত ইনিংসে মাত্র ৮০ রান করা অভিষেক সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও মাত্র ৯ রানে আউট হন। এই অফ-ফর্ম নিয়ে মুখ খুলেছেন ভারতের সাবেক তারকা ব্যাটার মোহাম্মদ কাইফ।
নিজের ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় কাইফ সরাসরি কোচ গৌতম গম্ভীরকে পরামর্শ দিয়েছেন অভিষেককে বিশ্রাম দেওয়ার। কাইফের মতে, ‘অভিষেক এখনো তরুণ এবং আইসিসি ইভেন্টের চাপ সামলানোর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। বড় মঞ্চে অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক। ওয়েস্ট ইন্ডিজ যেমন ফর্মহীন ব্র্যান্ডন কিংকে বসিয়ে রোস্টন চেজকে খেলিয়ে সফল হয়েছে, ভারতেরও উচিত অভিষেককে বসিয়ে রিঙ্কু সিংকে খেলানো।
কাইফ আরও যোগ করেন যে, রিঙ্কু সিং একজন ‘প্রমাণিত পারফর্মার’, যিনি রঞ্জি থেকে আইপিএল সবখানেই রান করেছেন। ডাগআউটে রিঙ্কুর মতো একজন খেলোয়াড়কে বসিয়ে রেখে অফ-ফর্মে থাকা কাউকে খেলানো ঝুঁকি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে বোলিং শক্তি বাড়াতে চাইলে কুলদীপ যাদব বা মোহাম্মদ সিরাজকেও ভাবনায় রাখতে পারেন গম্ভীর।
বরাবরের মতোই নিউজিল্যান্ড এই টুর্নামেন্টে ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে ফাইনালে উঠেছে। তারা খুব বেশি শোরগোল করে না, কিন্তু মাঠে তাদের শৃঙ্খলা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে আলাদা। ব্যাটিংয়ে তাদের তুরুপের তাস গ্লেন ফিলিপস। দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি তার ফিল্ডিংও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ভারতের বিশ্বসেরা ব্যাটারদের আটকে দিতে কিউই বোলাররা প্রতিটি বলের জন্য আলাদা পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামবে এমনটাই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
টুর্নামেন্টের শুরুতে সঞ্জু স্যামসনের জায়গা নিয়ে সংশয় থাকলেও, তিনি সমালোচকদের ব্যাট হাতে জবাব দিয়েছেন। বিশেষ করে নকআউট পর্বে তার দায়িত্বশীল ব্যাটিং ভারতকে বারবার রক্ষা করেছে। মোহাম্মদ কাইফের মতে, অভিষেকের সাথে সঞ্জুর তুলনা চলে না কারণ সঞ্জু টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ৮ হাজারেরও বেশি রানের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন পরিপূর্ণ খেলোয়াড়। এই অভিজ্ঞতাই আজ আহমেদাবাদের বিশাল গ্যালারির চাপ সামলাতে সাহায্য করবে।
আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে টস একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। রাতের শিশির বা ‘ডিউ ফ্যাক্টর’ মাথায় রেখে অধিনায়ক সুরিয়া হয়তো টস জিতলে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ভারতের ড্রেসিংরুমে আছেন ‘মেন্টর’ গৌতম গম্ভীর, যিনি দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক আজ কিউইদের ধীরস্থির পরিকল্পনাকে চ্যালেঞ্জ জানাবে।
ভারতের তারকার ঝলকানি নাকি নিউজিল্যান্ডের দলগত সংহতি জয় কার হবে? ভারত যদি পাওয়ারপ্লে-তে উইকেট না হারিয়ে বড় সংগ্রহ গড়তে পারে, তবে কিউইদের জন্য লড়াই কঠিন হবে। অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ড যদি শুরুতেই সুরিয়া বা হার্দিককে ফিরিয়ে দিতে পারে, তবে ট্রফি কিউইদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে।
আজকের রাতটি কেবল একটি ক্রিকেট ম্যাচ নয়, এটি ১৬ বছরের অপেক্ষার (টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে) অবসান ঘটানোর সুযোগ ভারতের সামনে। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড চাইবে তাদের দীর্ঘদিনের ‘রানার্স আপ’ তকমা ঘুচিয়ে প্রথমবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মুকুট মাথায় পরতে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আহমেদাবাদের আকাশ উদ্ভাসিত হবে আতশবাজিতে, আর ক্রিকেট বিশ্ব পাবে তার নতুন রাজা।
এএন