আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম
রয়টার্সের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম অস্থিরতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে ইরানে টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে সামরিক অভিযান চালানোর একটি গোপন ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। এই পরিকল্পনাটি আগের যেকোনো সংঘাতের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ ও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের ঘনঘটা। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে। মার্কিন প্রশাসনের দুইজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী এক বড় ধরনের অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার সাথে সাথেই এই হামলা শুরু হতে পারে। গোয়েন্দা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযানটি হবে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের একটি নিরবচ্ছিন্ন সামরিক কর্মকাণ্ডের চক্র যা আগে কখনও দেখা যায়নি।
সম্প্রতি নর্থ ক্যারোলাইনায় এক সামরিক ঘাঁটিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে কূটনৈতিক সমঝোতার বিষয়ে কিছুটা নিরাশাবাদ প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কখনও কখনও শান্তি ফেরাতে ভয় তৈরি করতে হয়। সত্যি বলতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার এটাই একমাত্র কার্যকর উপায়।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টেবিলে এখন সব ধরনের বিকল্প খোলা আছে। তিনি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ বিবেচনায় রেখে যেকোনো সময় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ঘোষণা দিতে পারেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য এই অভিযান সফল করতে পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ পাঠাচ্ছে। এর আগে থেকেই ওই অঞ্চলে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মোতায়েন রয়েছে। নতুন প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত কয়েক হাজার সেনা যারা বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে অবস্থান নেবে। এছাড়া গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার যা ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। সেই সাথে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান যা গত বছর মিডনাইট হ্যামার অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা প্রতিহত করবে।
গত জুনে পরিচালিত মিডনাইট হ্যামার অভিযানে মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। কিন্তু বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী এবার মার্কিন বাহিনী ইরানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সামরিক অবকাঠামো এবং ইসলামী বিপ্লবী গার্ডের প্রধান ঘাঁটিগুলোতেও আঘাত হানতে পারে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এটি কেবল একটি একক হামলা হবে না বরং তারা কয়েক সপ্তাহের একটি পাল্টাপাল্টি হামলার চক্রের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।
ইরানও চুপচাপ বসে নেই। ইসলামী বিপ্লবী গার্ড স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো আর নিরাপদ থাকবে না। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ইরানের শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এই সংঘাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপান্তর করতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম মন্দা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো সামরিক প্রস্তুতির সমান্তরালে ওমানের মাসকাটে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক আলাপচারিতাও চলছে। ইরান শর্ত দিয়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার আগে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফরের পর ট্রাম্পের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। নেতানিয়াহু সাফ জানিয়েছেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে যাওয়া যাবে না।
ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি এবং পেন্টাগনের সামরিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য এখন একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কূটনীতি কি শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে নাকি কয়েক সপ্তাহের এই পরিকল্পিত হামলা বিশ্ব রাজনীতিকে নতুন কোনো অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে সে উত্তর কেবল সময়ের হাতেই রয়েছে।
জেএইচআর