ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

বরগুনা-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে মরিয়া আটজন প্রার্থী

বেলাল হোসেন মিলন, বরগুনা প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২৫, ০৫:০৫ পিএম
বরগুনা-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে মরিয়া আটজন প্রার্থী

বঙ্গোপসাগরের তীরঘেষা উপকূলীয় জেলা বরগুনা এবং এ জেলার সংসদীয় আসন ১০৯ বরগুনা-১ বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই জেলায় রয়েছে অনেকগুলো সম্ভাবনাময় পর্যটনস্পট। জেলার অধিকাংশ মানুষের পেশা জেলে ও কৃষক। 

নদ-নদী বেষ্টিত পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় এই আসন বরাবরের মতোই আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত ছিল।

তবে ২০০১ সালের ১লা অক্টোবরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে নৌকা প্রতীক নিয়ে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন করলে নৌকা প্রতীক নিয়ে তৎকালীন জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী মতিয়ার রহমান তালুকদারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অল্প ভোটের ব্যবধানে তিনি নির্বাচিত হন। 

২০০২ সালের ১৭ জানুয়ারি উপনির্বাচনে শেখ হাসিনা এ আসনটি ছেড়ে দিলে মতিউর রহমান তালুকদার বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে বিজয়ী হন।

চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে পাল্টে যায় এখানকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বর্তমানে মাঠ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি নেই। এই সুযোগে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলো।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রায় ছয় মাস আগেই জেলার এ আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। 

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরাও ভোটারদের মন জোগাতে গণসংযোগ ও সভা-সমাবেশে ব্যস্ত রয়েছেন। আগামী বছর ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে পারে এমন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এখন পুরোদমে মাঠে নেমে পড়েছে বিএনপি সহ সমমনা দলগুলো। 

তবে এখন পর্যন্ত এ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদসহ অন্যান্য দলের তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।

বরগুনা-১ আসন বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী নিয়ে গঠিত। আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে এখন পর্যন্ত বিএনপির ৮ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী এলাকায় ব্যাপকহারে গণসংযোগ ও কেন্দ্রে দৌড়ঝাপ চালাচ্ছেন।

এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাচ্ছেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে জেলা বিএনপির আহবায়ক নজরুল ইসলাম মোল্লা, বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য সাবেক কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলহাজ্ব মতিয়ার রহমান তালুকদার, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক ফিরোজ-উজ-জামান মামুন মোল্লা, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফজলুল হক মাস্টার, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব হুমায়ুন হাসান শাহিন, সাবেক আমতলী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফরমের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গাজী তৌহিদুল ইসলাম, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. রেজবুল কবির, বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের এপিএস ও জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য ওমর আব্দুল্লাহ্ শাহীন।

এদের মধ্যে নজরুল ইসলাম মোল্লাকে ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবেক সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমান তালুকদারের সাথে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। 

পরবর্তীতে বিএনপি মতিউর রহমান তালুকদারের মনোনয়ন চূড়ান্ত করলে নজরুল মোল্লা তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।

দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারে বরগুনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, “সারা জীবন বিএনপির রাজনীতি করেছি। ছাত্রদল করেছি, দীর্ঘদিন জেলা যুবদলের সভাপতি ছিলাম। জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও চার বছর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। শেখ হাসিনার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মাঠে সক্রিয় ছিলাম। রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছিল। আবার দলের সিদ্ধান্ত মেনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছি। তিন তিনবার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। দিন-রাত সাধারণ মানুষের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছি। আশা করি দল নিশ্চয়ই আমার এসব কাজের মূল্যায়ন করবে।”

সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মতিয়ার রহমান তালুকদার বলেন, “আমতলী ও তালতলীতে আমি ছাড়া আর কেউ কোন উন্নয়ন করেনি, তাই সাধারণ মানুষ আমার সঙ্গে আছে। আমি দলের প্রতি বিশ্বাস রাখি, দল আমাকে মনোনয়ন দিবে।”

জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও বর্তমান কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক প্রবীণ রাজনীতিবিদ ফজলুল হক মাস্টার বলেন, “আমি আশা করি দল আমাকে মনোনয়ন দিবে।”

বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক ফিরোজ-উজ-জামান মামুন মোল্লা বলেন, “মাঠে ছিলাম, আছি ও থাকবো। বিএনপির হাইকমান্ডের উপরে আমার আস্থা ও বিশ্বাস আছে। আমার ত্যাগ ও জনসম্পৃক্ততার বিষয় খোঁজখবর নিয়ে দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।”

জেলা বিএনপির সদস্য সচিব হুমায়ুন হাসান শাহিন বলেন, “দলীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আমাকে যোগ্য মনে করলে দল আমাকে মনোনয়ন দিবে। দল যে সিদ্ধান্ত নিবে, সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি একমত।”

সাবেক আমতলী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফরমের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গাজী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সময় দলের প্রতিটি প্রোগ্রামে রাজপথে ছিলাম এবং অসংখ্য দলীয় নেতাকর্মীর মামলা নিষ্কর করেছি। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে নিশ্চিত এই আসনে বিজয় হব।”

জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. রেজবুল কবির বলেন, “আমি বরগুনা সদর উপজেলাকে বুঝি, ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিয়েছি। সাধারণ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। আমাকে মনোনয়ন দিলে এই আসনে বিজয়ের মালা পড়তে পারব।”

বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের এপিএস ও জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য ওমর আব্দুল্লাহ্ শাহীন বলেন, “বিগত ১৭ বছর ৭ মাস পতিত মাফিয়া-খুনি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে আমি ও আমার পরিবার গুম, হামলা, মামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হয়েছি। তবুও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিঃস্বার্থ মুক্তি এবং মাননীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে নিরলসভাবে কাজ করছি। তাই আমি প্রত্যাশা করছি দল আমাকে মনোনয়ন দেবেন।”

২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনায় মোট আসন সংখ্যা ছিল ৩টি। বরগুনা ও বেতাগী উপজেলা নিয়ে বরগুনা-১ আসন। বামনা ও পাথরঘাটা উপজেলা নিয়ে বরগুনা-২ আসন এবং আমতলী ও তালতলী নিয়ে বরগুনা-৩ আসন। পরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ২০০৮ সালে ১/১১ সরকারের সময় আসন সংখ্যা কমিয়ে ২টি করা হয়। ১০৯ বরগুনা-১ আসনটি বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী উপজেলা নিয়ে গঠিত।

জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা-১ আসনে মোট ভোটার ৪,৮৩,৯১৭ জন। 

বরগুনা সদর উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২,৬৫,৭৪১ জন এবং আমতলী-তালতলী উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২,৯২,১৩৩ জন। বরগুনা সদর উপজেলা থেকে আমতলী-তালতলী উপজেলার ভোটার সংখ্যা ২৬,৩৯২ জন বেশি।

ইএইচ