খুলনায় আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে জোড়া খুন: আতঙ্কে নগরী

বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশিত: নভেম্বর ৩০, ২০২৫, ০৯:২৯ পিএম
খুলনায় আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে জোড়া খুন: আতঙ্কে নগরী

খুলনায় আদালতের প্রধান ফটকের সামনের ব্যস্ত সড়কে দিনের আলোয় দুই যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় পুরো নগরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। 

রোববার দুপুরে ঘটে যাওয়া এ হত্যাকাণ্ডকে পুলিশ সমন্বিত পরিকল্পনার ফল বলে মনে করছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও প্রাথমিক তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ‘গ্রেনেড বাবু’ গ্রুপের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী পলাশ গ্রুপের বিরোধই হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রধান কারণ হতে পারে।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজিরা দিয়ে বের হচ্ছিলেন হাসিব হাওলাদার (৪১) ও ফজলে রাব্বি রাজন (৩৭)। প্রধান ফটক থেকে সবে মাত্র কয়েক কদম এগোতেই হঠাৎ করে ছয় সাতজনের একটি দল মোটরসাইকেল থামিয়ে দ্রুত তাদের দিকে ধেয়ে আসে। 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দলের একজন প্রথমে পেছন দিক থেকে রাব্বির ঘাড়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেয়। আতঙ্কিত রাব্বি ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই আরেক হামলাকারী বন্দুক মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করে। একই মুহূর্তে আরেকজন হাসিবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। দুজন মাটিতে পড়ে গেলে হামলাকারীদের কয়েকজন এলোপাতাড়ি ধারালো অস্ত্রে কোপাতে থাকে।

চার–পাঁচ মিনিটের পুরো ঘটনাটি ঘটে মানুষের চোখের সামনে। আশপাশের দোকানপাট, রিকশা–ভ্যান ও আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে আশ্রয় নেন। ভয়াবহ দৃশ্যটি মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। 

এক ভিডিওতে দেখা যায়, রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা এক ব্যক্তির গায়ে আরেকজন লম্বা ছুরি নিয়ে বারবার কোপ বসাচ্ছে, আর কয়েকজন বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে।

হাসিব ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহত রাব্বিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা কিছুক্ষণ পর তাঁকেও মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা জানান, দুজনেরই মাথা, মুখ, বুক ও পিঠে গুলি ও ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল।

নিহত হাসিব হাওলাদার নগরের নতুনবাজার ওয়াপদা বেড়িবাঁধের মিনারা গলি এলাকার বাসিন্দা। এলাকায় মাছের ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হলেও গত সাত–আট মাস ধরে তিনি বাড়িতে থাকতেন না বলে পরিবারের সদস্যরা জানাচ্ছেন। পরিচিত এক ইজিবাইকচালক তার লাশ বাড়ির কাছে নিয়ে গেলে এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরে পুলিশ লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।

ফজলে রাব্বি রাজন রূপসা উপজেলার পূর্ব রূপসার বাগমারা আবদুর রবের মোড় এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বাড়িতেও শোকের আবহ। পরিবার বলছে, রাব্বি আদালতে হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার পরপরই এই দুর্ঘটনার শিকার হন। পুলিশ জানায়, দুজনের বিরুদ্ধেই আলাদা আলাদা থানায় ছয়টি করে মামলা ছিল, যার মধ্যে অস্ত্র, হত্যাচেষ্টা, দ্রুত বিচার আইনের মামলা ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ বলছে, নিহত দুজনই কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ রনি চৌধুরী ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’ বহুদিন ধরে এলাকাজুড়ে আধিপত্য নিয়ে পলাশের গ্রুপের সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। কয়েক দিন আগে কারাগারের ভেতরে দুই পক্ষের বন্দিদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছিল। সেই উত্তেজনার ধারাবাহিকতাতেই আদালত এলাকায় প্রকাশ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এটি খুব পরিকল্পিত অপারেশন ছিল। হামলাকারীরা টার্গেট চিহ্নিত করেই এসেছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা কাজ শেষ করে পালিয়ে যায়। প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের পুরোনো সংঘাতই এর কারণ বলে আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করছি।’

তিনি আরও জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে ভিডিও ফুটেজ, আশপাশের সিসিটিভি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সার্কিট হাইসের মূল ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, হঠাৎ বিকট শব্দ হলো, প্রথমে ভেবেছিলাম টায়ার ফেটেছে। তাকিয়ে দেখি দুইজন রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে। কয়েকজন অস্ত্র হাতে দৌড়াচ্ছে। লোকজন আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু করে দেয়।’

আরেকজন বলেন, এত দ্রুত সবকিছু ঘটেছে যে বোঝাই যায়নি কী হচ্ছে। যারা হামলা করেছে তারা অস্ত্রসহ এমনভাবে চলে গেছে যেন আগে থেকেই বের হওয়ার পথ নিশ্চিত ছিল।

খবর পেয়ে সদর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে। সিআইডি, পিবিআই ও গোয়েন্দা পুলিশের দল একসঙ্গে তদন্তে নামে। সড়ক থেকে রক্তের নমুনা, বুলেট, খোসা, ব্যবহৃত অস্ত্রের চিহ্নসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে বলে পুলিশ জানায়। আদালত এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

সদর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম জানান, এটি খুব সংবেদনশীল ঘটনা। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। নিহতরা পলাশ গ্রুপের সদস্য হওয়ায় গ্রেনেড বাবু গ্রুপের সম্পৃক্ততা আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

আদালত এলাকায় এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। বিচারপ্রার্থী মানুষ ও আইনজীবীরা বলছেন, আদালত চত্বর নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়লে ন্যায়বিচারের জায়গাতেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। এক আইনজীবী বলেন, আদালতের সামনে দিনের আলোয় এমন ঘটনা নজিরবিহীন। এটি পরিকল্পিত অপরাধ, এবং নিরাপত্তা ঘাটতিরও ইঙ্গিত দেয়।

হাসিব ও রাব্বির পরিবার বলছে, তাদের সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। তাঁরা অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেছেন। দুজনের জানাজা সম্পন্ন করতে এলাকায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

খুলনা মহানগরে দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি চিহ্নিত অপরাধী গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য নিয়ে সংঘাত চলে আসছে। এর আগেও বিভিন্ন এলাকায় গুলি ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, গ্রুপভিত্তিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তারা আশা করছে, এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের দ্রুত তদন্ত ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

ইএইচ