চালকের ক্ষণিক উত্তেজনা, কেড়ে নিল চার প্রাণ

দাউদকান্দিতে বাসে অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ০২:১৩ পিএম
দাউদকান্দিতে বাসে অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য


ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি অংশে শুক্রবার দুপুরে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটে গেল। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাস উল্টে যাওয়ার পর মুহূর্তেই তাতে আগুন ধরে যায়। আগুনের লেলিহান শিখায় দগ্ধ হয়ে দুই শিশুসহ চারজন যাত্রী না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তবে এই দুর্ঘটনার নেপথ্যে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং চালকের অপেশাদার আচরণ এবং তুচ্ছ এক বাগ্‌বিতণ্ডাকে দায়ী করছেন প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে ফেরা যাত্রীরা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও বাসের যাত্রীদের ভাষ্যমতে, ঘটনার সূত্রপাত দাউদকান্দির আমিরাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে। সেখানে একজন পুরুষ যাত্রী বাসে ওঠেন। গন্তব্যস্থলে নামানো নিয়ে চালক ও তার সহকারীর সাথে ওই যাত্রীর তীব্র কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যাত্রীটি যেখানে নামতে চেয়েছিলেন, চালক সেখানে বাস থামাতে রাজি ছিলেন না। এই নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলাকালীন চালক সড়কের দিকে মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। ক্ষোভ আর উত্তেজনা নিয়ে দ্রুতগতিতে বাসটি চালাতে থাকেন তিনি।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহমুদ নেয়ামত উল্লাহ। তিনি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা তার স্বপ্ন এবং আরও অনেকের জীবন তছনছ করে দিয়েছে। 

নেয়ামত উল্লাহ বলেন, বাসটি যখন বানিয়াপাড়া এলাকায় পৌঁছায়, তখন চালক তখনও ওই যাত্রীর সাথে তর্কে লিপ্ত ছিলেন। তিনি চরম অমনোযোগী ছিলেন। সামনে একটি মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা দেখে তিনি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। মুহূর্তে বাসটি উল্টে যায় এবং বিকট শব্দে আগুন ধরে যায়। 

একই বাসের আরও কয়েকজন যাত্রী জানিয়েছেন, চালকের মেজাজ ছিল খিটখিটে। তুচ্ছ একটি নামা-ওঠা নিয়ে তিনি যেভাবে উত্তেজিত হয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল যেকোনো সময় বড় কোনো বিপদ ঘটতে পারে। আর সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো বানিয়াপাড়া এলাকায়।

বাসটি উল্টে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জ্বালানি ট্যাঙ্ক থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাসে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ভেতরে থাকা যাত্রীরা জীবন বাঁচাতে জানালা ও দরজায় হুড়োহুড়ি শুরু করেন। কিন্তু দুর্ভাগা চারজন, যাদের মধ্যে দুটি অবুঝ শিশু ছিল, তারা আগুনের গ্রাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। চোখের সামনেই দগ্ধ হয়ে কয়লা হয়ে যান তারা।

দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। স্থানীয়রা দ্রুত এগিয়ে এসে জানালার কাঁচ ভেঙে অনেককে উদ্ধার করেন। আহতদের দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে ১২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দগ্ধ ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনার নিয়মিত পরিসংখ্যানের বাইরে এই ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে চালকদের মানসিক অস্থিরতা এবং পেশাদারত্বের অভাব। মহাসড়কে উচ্চগতিতে গাড়ি চালানোর সময় চালকের মনোযোগ যেখানে থাকা উচিত শতভাগ সড়কের দিকে, সেখানে একজন যাত্রীর সাথে তর্কে লিপ্ত হওয়াকে অপরাধমূলক অবহেলা হিসেবে দেখছেন বিশিষ্টজনরা। 

নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে এখন দাউদকান্দির আকাশ-বাতাস ভারী। একজন পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা দেওয়া হলো না, দুই শিশুর পৃথিবী দেখা হলো না চিরতরে, এসবের দায়ভার কে নেবে?

ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি উদ্ধার করে। পুলিশ জানিয়েছে, চালক ও তার সহকারী ঘটনার পর থেকেই পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। বাসের ভেতরে থাকা যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী চালকের অবহেলার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে।

মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো কীভাবে মহাসড়কের মূল লেনে চলে আসে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। একই সাথে চালকদের ডোপ টেস্ট এবং নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার দাবিও জোরালো হচ্ছে। 

সাধারণ মানুষ বলছেন, একজনের জেদ আর রাগের বলি কেন সাধারণ যাত্রীরা হবে? আজকের এই চারজনের মৃত্যু কি শুধুই একটি দুর্ঘটনা, নাকি একটি সুপরিকল্পিত গাফিলতি, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বানিয়াপাড়ার এই সড়ক বিভীষিকা সারা দেশের মানুষের মনে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। সড়কে শৃঙ্খলা না ফেরা পর্যন্ত এবং চালকদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এমন অমনোযোগের মূল্য সাধারণ মানুষকে রক্ত দিয়ে দিতে হবে।

জেএইচআর