ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের নির্বাচনী প্রচারণায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ এবং হুমকি দেওয়ার অভিযোগে শোকজের মুখে পড়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। দায়িত্বপালনরত বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘মব’ বা গণজমায়েত সৃষ্টি করে ভয় দেখানো এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে তাঁকে আগামী ২২ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান এই আদেশ জারি করেন।
ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার বিকেলে সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের ইসলামপুর এলাকায়। সেখানে রুমিন ফারহানা প্রায় ৪শ থেকে ৫শ মানুষের উপস্থিতিতে একটি নির্বাচনী জনসভা করছিলেন। অভিযোগ ওঠে, তিনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বিশাল মঞ্চ নির্মাণ এবং মাইক ব্যবহার করে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। খবর পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে পৌঁছে সমাবেশটি বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তার পাঠানো নোটিশের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যখন আইন প্রয়োগ করতে যান, তখন রুমিন ফারহানা তাঁর সঙ্গে অত্যন্ত অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।
নোটিশে রুমিন ফারহানার কথিত বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, রুমিন ফারহানা ম্যাজিস্ট্রেটকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বলেন, আমি যদি না বলি এখান থেকে বাইরে যেতে পারবেন না, মাথায় রাইখেন। আজকে আমি আঙুল তুলে বলে গেলাম, ভবিষ্যতে শুনব না। দিস ইজ দ্য লাস্ট টাইম, আই অ্যাম ওয়ার্নিং ইউ।
অভিযোগ উঠেছে, তিনি সেখানে উপস্থিত লোকজনকে উসকে দিয়ে একটি 'মব' বা মারমুখী জনতা তৈরির চেষ্টা করেন, যা ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারিক কাজে সরাসরি বাধা হিসেবে গণ্য হয়েছে। ঘটনার এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
এই ঘটনার পর সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আবুবকর সরকার বিষয়টি নিয়ে সিনিয়র সিভিল জজ ও নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির প্রধান আশরাফুল ইসলামের কাছে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
শনিবার সন্ধ্যায় একই ইউনিয়নের ইসলামাবাদ গ্রামে অন্য একটি উঠান বৈঠকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে রুমিন ফারহানাকে ইতিমধ্যে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে হুমকির বিষয়টি আরও গুরুতর হওয়ায় রিটার্নিং কর্মকর্তা সরাসরি ব্যবস্থা গ্রহণের পথে হেঁটেছেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জাহান তাঁর আদেশে উল্লেখ করেছেন যে, রুমিন ফারহানার এহেন কর্মকাণ্ড ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
হাজিরা: আগামী ২২ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) বেলা ১১টায় তাঁকে সশরীরে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শর্ত: যদি তিনি নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারেন, তবে তাঁর অনুপস্থিতিতেই কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যার মধ্যে প্রার্থিতা বাতিলের মতো সুপারিশও থাকতে পারে।
রুমিন ফারহানা তাঁর সপাটে বক্তব্যের জন্য পরিচিত হলেও, প্রশাসনের একজন কর্মকর্তাকে সরাসরি হুমকি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, যদি প্রার্থীদের এ ধরনের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের এই স্বতন্ত্র প্রার্থীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ২২ জানুয়ারির শুনানিতে তিনি কী ব্যাখ্যা দেন এবং নির্বাচন কমিশন তাঁর বিরুদ্ধে কী চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে সরাইল ও আশুগঞ্জের ভোটাররা। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কতটা কঠোর হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন