বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারকে ‘পাকিস্তানি ভাবধারার’ প্রবর্তন হিসেবে উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করে তিন পার্বত্য জেলায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর সহ-সভাপতি নূতন কুমার চাকমা।
শনিবার সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিএনপির ইশতেহারকে ‘মনভোলানো চটকদার বুলির সমাহার’ আখ্যা দিয়ে তিনি এ আহ্বান জানান।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার প্রত্যাখ্যান করে তিন পার্বত্য জেলায় দলটির মনোনীত প্রার্থীদের ভোট না দিতে এবং খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থনেরও আহ্বান জানিয়েছে ইউপিডিএফ।
বিএনপির ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’কে প্রচ্ছন্নভাবে ‘পাকিস্তানি ভাবধারার’ প্রবর্তন হিসেবে উল্লেখ করে নূতন কুমার বলেন, “ধর্মীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের থেকে পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমানদের পৃথকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা এতে প্রতিফলিত হয়েছে।”
এতে বাঙালি ছাড়া অন্যান্য জাতিসত্তার স্বীকৃতি, মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার মৌলিক বিষয়গুলো স্থান পায়নি দাবি করে নূতন কুমার চাকমা বলেন, “এ সত্যটি বিএনপি সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে।”
বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমরা জাতি হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন। যেমন বাঙালি, চাকমা, মারমা ত্রিপুরা, গারো, মনিপুরী, সাঁওতাল ইত্যাদি। তবে নাগরিক হিসেবে আমরা সবাই বাংলাদেশি। বাংলাদেশি পরিচয় আমাদের নাগরিকত্বের পরিচয়; জাতীয়তার পরিচয় নয়।”
এ সত্য ও বাস্তবতা স্বীকার না করে সংখ্যালঘু জাতিগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিএনপির ইশতেহারে উল্লেখিত পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতিকে ‘অন্তসারশূন্য’ আখ্যায়িত করে ইউপিডিএফ নেতা নূতন কুমার বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের প্রতিশ্রুতি না থাকার মধ্যে এই ইঙ্গিত স্পষ্ট যে, বিএনপি তার আগের অবস্থান পরিবর্তন করেনি।
“আশির দশকে তারা পাহাড়ে সেটেলার পুনর্বাসন করেছিল ও দমন নীতি জারি রেখেছিল; তা থেকে সরে এসেছে এমন সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করতে বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে।”
তিনি বলেন, ইশতেহারে ‘টেকসই শান্তি স্থাপনের’ জন্য যে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে তা ‘অস্পষ্ট’ ও মূল সমস্যাকে পাশ কাটানোর চেষ্টা মাত্র।”
ইশতেহারে জনগণের মৌলিক দাবি স্বায়ত্তশাসন, ভূমি অধিকার, বেসামরিকীকরণ ও গণতন্ত্রায়ণ, মানবাধিকার, সেটলারদের সমতলে পুনর্বাসন, জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি, গণহত্যার বিচার এবং এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে গুইমারা, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালায় সংঘটিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলার বিচার করার প্রতিশ্রুতি পর্যন্ত নেই বলে নতুন চাকমা বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন।
ইশতেহারে ‘নৃ-গোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর’ গঠন এবং বেসরকারি উদ্যোগে ‘এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিকে ‘চটকদার বুলি’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার মূল কারণ অর্থনৈতিক অনুন্নয়ন নয়; বরং উন্নয়নকে সেখানে অধিকারবঞ্চিত জাতিগোষ্ঠীগুলোর ওপর নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।”
“তাই অতীতে যেভাবে তথাকথিত পর্যটনের জন্য নিরীহ গ্রামবাসীকে উৎখাত হতে হয়েছে, তাদের ভূমি বেদখল করা হয়েছে, ভবিষ্যতে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন গঠন করা হলে একই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি আরও বড় আকারে ঘটবে।”
তাই লোক ঠকানোর এই ইশতেহার পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের কাছে মোটেই গ্রহণযোগ্য হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ইউপিডিএফ নেতা বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারকে প্রত্যাখ্যান করে তিন পার্বত্য জেলায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের ভোট না দিয়ে খাগড়াছড়িতে স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমা ও রাঙামাটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমাকে ভোট দিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের দাবি-দাওয়া ও আশা-আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরতে ও তার জন্য সংগ্রাম করতে এছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন