ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনী উত্তাপ ততই বাড়ছে। নেত্রকোনা-৩ আসনে কেন্দুয়া-আটপাড়া আসনে ভোটের মাঠের আধিপত্যের দিকে এগিয়ে রয়েছে বিএনপি। কিন্তু আসনটিতে বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী থাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি খুব সহজেই জিতে যাবে একথা বলা যাবে না।
অপরদিকে বিএনপি বনাম বিদ্রোহী বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ভোটের ভাগাভাগি থাকায় এগারো দলীয় জোট সমর্থিত জামাত মনোনীত প্রার্থী এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বিএনপি বনাম বিদ্রোহী বিএনপিসহ দীর্ঘদিনের বিএনপির জোটসঙ্গী জামাত প্রার্থীও এবার লড়াইয়ে পরস্পর মুখোমুখি নির্বাচন করায় ভোটের মাঠে দেখা দিয়েছে নানা সমীকরণ। তবে বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলেছে নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থী।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, নেত্রকোণা-৩ (আটপাড়া–কেন্দুয়া) আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ ততই জটিল হয়ে উঠছে। এই আসনে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তিনটি নাম-বিএনপির রফিকুল ইসলাম হিলালী, বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো.দেলোয়ার হোসেন ভূঞা দুলাল এবং এগারো দলীয় জোট সমর্থিত জামাত প্রার্থী খায়রুল কবীর নিয়োগী। আপাতদৃষ্টিতে লড়াই বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে হলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
বিএনপি এই আসনে এবার ‘হার্ডলাইন’ কৌশলে এগোচ্ছে। মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি, কেন্দ্রভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক অভিযোগের ধারাবাহিক ব্যবহারে তারা স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য কোনো রাজনৈতিক ছাড় দিতে নারাজ। বিগত কয়েক দিনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়া তারই ইঙ্গিত দেয়। ফলে নির্বাচনী মাঠে উত্তাপ বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কাও।
অন্যদিকে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. দেলোয়ার হোসেন ভূঞা দুলাল স্থানীয়ভাবে পরিচিত মুখ, তৃনমুলের ভোটব্যাংকে যার প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। বিএনপি-স্বতন্ত্র দ্বৈরথে ভোট বিভাজনের বাস্তবতা ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। এই দ্বন্দ্বই নির্বাচনের মূল নাট্যভাগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই দ্বৈরথের আড়ালে নীরবে সাংগঠনিক কাজ এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মাঠে কম প্রচার, কম শব্দ কিন্তু পরিকল্পিত ভোট কেন্দ্রভিত্তিক সংগঠন। অতীতে এই কৌশল অনেক আসনেই ‘ডার্কহর্স’ প্রভাব তৈরি করেছে। নেত্রকোণা-৩ এ তেমন চমক হবে কি না, তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে কৌতূহল বাড়ছে।
গ্রামের চায়ের দোকান, বাজারের আড্ডা কিংবা সামাজিক আলোচনায় এখন তিনটি নামই ঘুরছে,“হিলালী না দুলাল?” নাকি “শেষ হাসি হাসবে নিয়োগী?”
এই প্রশ্নের উত্তর দেবে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারী। তার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ, ভোটার উপস্থিতি এবং নির্বাচন দিনের পরিবেশ। রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, নেত্রকোণা-৩ বরাবরই ‘সারপ্রাইজ’ দিতে সক্ষম একটি আসন। এই আসনের নির্বাচন শুধু প্রার্থী নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি হয়ে উঠেছে কৌশল, সংগঠন ও মনস্তত্ত্বের জটিল পরীক্ষাক্ষেত্র।
এসুযোগে জামায়াতও ঘাম ঝড়া পরিশ্রম করে স্থায়ী একটি ভোট ব্যাংক তৈরি করে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। জামায়াত ভোটারদের আস্থা নিয়ে নতুন ইতিহাস রচনা করতে জোটবদ্ধ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর হিসাব কাজে লাগিয়ে কৌশলে কাজে করে যাচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। তবে শেষ পর্যন্ত সব হিসাব-নিকাশ ফেলে চূড়ান্ত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বিএনপি, বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) ও এগারো দলীয় জোট সমর্থিত জামায়াত প্রার্থীর মধ্যেই। এই লড়াইয়ে কোন দল জয়ী হবে, তা আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক দল তিনটির ভোটারদের মাঝে নিজ দলের আদর্শ ও প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভর করছে।
এদিকে, জাতীয় পার্টি আসনটিতে জোড় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য ওই প্রার্থী মাঠে নেমে ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীকে চাঙা করে ভোটের মাঠে ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু কর্মীদের জুলাই বিপ্লব নিয়ে ভোটারের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিয়ে ভোটারদের মনজয় করতে পারলেও শেষঅবধি ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মত দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এব্যাপারে নেত্রকোনা-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী রফিকুল ইসলাম হিলালী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান।
তিনি বলেন, ‘শুধু ভোট বা কথা বলার অধিকার নয়, মানুষকে স্বাবলম্বী করতে আমি কাজ করব। দেশের নারীসমাজ, মা-বোন, যুবসমাজ, কৃষকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে বিএনপি আগামীর বাংলাদেশ গড়তে চায়।
তিনি আরো বলেন,মানুষের প্রত্যাশার নতুন বাংলাদেশ গড়তে চায় বিএনপি। নির্বাচনকে বানচাল করতে ষড়যন্ত্র চলছে, কোনো ষড়যন্ত্রই বিএনপির বিজয় ঠেকাতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।
বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো দেলোয়ার হোসেন ভূঞা দুলাল বলেন, আমি কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও পৌরসভার সাবেক মেয়র ছিলাম। আমার সাথে জনগণের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। এখনো নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যাহত করতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র চলছে। গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন ভোটের অধিকার কেউ কেড়ে নিতে না পারে। যদি নির্বাচন সুষ্টু ও স্বচ্ছ হয়, তবে আমার বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না বলে জানান তিনি।
জামাতের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী খায়রুল কবীর নিয়োগী বলেন, আপনারা ধানের শীর্ষ ও নৌকাকে দেখেছেন। এবার দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেন। জামাত ক্ষমতায় গেলে ন্যায় ও ইনসাফের সরকার গঠন করবে। তিনি আরো বলেন, আপনার সন্তানকে মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে বাঁচাতে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিন। যুব সমাজকে মাদক থেকে ফিরাতে সব ধরনের সহযোগিতা ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে ইনশাআল্লাহ।
নেত্রকোনা-৩ আসনটি কেন্দুয়া ও আটপাড়া এই দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই দুই উপজেলায় রয়েছে ২০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা। এআসনে পোষ্টালসহ ৪,২০,৬৮৭ ভোটার রয়েছে। আসটিতে মনোনয়ন বৈধতা পেয়ে ৬ জন প্রার্থী নিজ নিজ প্রতীক নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে রফিকুল ইসলাম হিলালী, বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোড়া প্রতীকে মো.দেলোয়ার হোসেন ভূঞা দুলাল, এগারো দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে খায়রুল কবীর নিয়োগী, জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকে আবুল হোসেন তালুকদার , ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী জাকির হোসেন, এবং ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ এর প্রার্থী মো.শামসুদ্দোহা চেয়ার প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন