ভোলায় যুবলীগ নেতাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা

ভোলা প্রতিনিধি প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
ভোলায় যুবলীগ নেতাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা

ভোলার চরফ্যাশনে এক রক্তাক্ত সংঘাতের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল একটি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনের। চরফ্যাশন ও মনপুরা আসন নিয়ে গঠিত ভোলা-৪ আসনের নির্বাচনী আমেজ এখনো শেষ হয়নি, ঠিক তার মাঝেই চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে চরম নিষ্ঠুরতার শিকার হলেন আবদুর রহিম (৪৫) নামের এক ব্যক্তি। স্থানীয় যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত আবদুর রহিমকে গত শনিবার রাতে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, হত্যাকাণ্ডের ঠিক আগের দিন তাঁর ছেলেকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছিল।

এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আওয়ামী লীগ-বিএনপি বিরোধের এক জটিল রসায়ন সামনে আসছে। ঘটনায় অভিযুক্তরা ভোলা-৪ আসনে নবনির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য নুরুল ইসলামের (নয়ন) অনুসারী হিসেবে পরিচিত হওয়ায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত রাজনৈতিক আদর্শের চেয়েও অদ্ভুত এক তুচ্ছ কারণে, যা চরম নিষ্ঠুরতায় রূপ নেয়। স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের দাবি অনুযায়ী, নির্বাচনের আগের দুই রাতে আবদুর রহিমের পালন করা দুটি খাসি জোরপূর্বক জবাই করে খেয়ে ফেলেন স্থানীয় আমজাদ হোসেন, বিল্লাল হোসেন এবং সম্রাটসহ কয়েকজন। এঁরা সবাই নবনির্বাচিত এমপি নুরুল ইসলামের সমর্থক হিসেবে এলাকায় পরিচিত।

নিহত আবদুর রহিমের পরিবারের সদস্যরা মূলত বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাজিম উদ্দিন আলমের অনুসারী। অথচ আবদুর রহিম নিজে ব্যক্তিগত পছন্দের জায়গা থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিজের কষ্টার্জিত ছাগল জবাই করার প্রতিবাদ করায় গত শুক্রবার রাতে আবদুর রহিমের ছেলে আমির হোসেনকে বর্বরোচিতভাবে পেটানো হয়। হামলায় আমিরের মুখের হাড় ও চোয়াল ভেঙে যাওয়ায় তাঁকে বর্তমানে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে।

ছেলের ওপর এই হামলার প্রতিবাদ এবং ‘ছাগলখেকোদের’ গালমন্দ করায় শনিবার রাতে প্রাণ দিতে হলো খোদ আবদুর রহিমকে।

শনিবার রাত ১০টার দিকে রসুলপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কলেরহাট রাস্তার মাথায় চা পান করে বাড়ি ফিরছিলেন আবদুর রহিম। বাড়ির একদম কাছাকাছি পৌঁছামাত্র ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

নিহতের মেয়ে বিবি রহিমা সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘বাবা বাড়ির উত্তরে আসতেই ঘাতকরা তাঁর গলার দুই পাশে এবং কপালে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেয়। বাবার চিৎকার শুনে আমরা দৌড়ে আসি। এসে দেখি বিল্লাল হোসেন নামের একজন নতুন রাস্তা দিয়ে পালাচ্ছে। আমার বাবাকে রাস্তার পাশে কচুরিপানার মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছিল। আমি নিজের ওড়না দিয়ে বাবার গলা পেঁচিয়ে রক্ত আটকানোর চেষ্টা করছিলাম আর চিৎকার করছিলাম, কিন্তু কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।’

পরে স্বজনরা তাঁকে উদ্ধার করে চরফ্যাশন হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

আশ্চর্যজনকভাবে আবদুর রহিমের পুরো পরিবার বিএনপির রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রহিমের বড় ভাই মফিজুল ইসলাম জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা দেওয়া হয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘আমার ভাই রহিম আওয়ামী লীগকে পছন্দ করত, তবে সে খুব সক্রিয় ছিল না। সে মাটি কাটার কাজ করত, ছাগল পালত আর কৃষিকাজ করত। আমাদের পরিবারের বাকি সবাই বিএনপির অনুসারী।’

স্থানীয়রা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ড কেবল বিএনপি-আওয়ামী লীগ বিরোধ নয়, বরং বিএনপির দুই শক্তিশালী নেতা নাজিম উদ্দিন আলম এবং নুরুল ইসলামের সমর্থকদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়েরই একটি বহিঃপ্রকাশ।

হত্যাকাণ্ডের দায়ভার নিতে অস্বীকার করেছে স্থানীয় বিএনপি। চরফ্যাশন উপজেলা বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক কামাল গোলজার দাবি করেছেন, এই ঘটনার সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর মতে, এটি মাদক কেনাবেচা সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল।

অন্যদিকে, শশীভূষণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আবদুর রহিম একসময় আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতি করতেন। প্রাথমিকভাবে খাসি খাওয়া এবং মাদক সংক্রান্ত বিরোধকেই এই হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং তাঁর পরিবার দাফন সম্পন্ন করার পর মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড চরফ্যাশন এলাকার সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। মাদক ব্যবসা আর রাজনীতির লেবাসে যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী।

এএন