দখল, পানি শূন্যতা ও আবর্জনায় অস্তিত্ব সংকটে গোয়ালন্দের পদ্মা

মো. সাজ্জাদ হোসেন, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রকাশিত: এপ্রিল ৫, ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম
দখল, পানি শূন্যতা ও আবর্জনায় অস্তিত্ব সংকটে গোয়ালন্দের পদ্মা

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার এক সময়ের ব্যস্ততম নৌরুটখ্যাত পদ্মা এখন “মরা পদ্মা” নামে পরিচিতি লাভ করেছে। দখল, আবর্জনা, কচুরিপানা ও পানির অভাবে মরতে বসেছে পদ্মা নদী। জৌলুস হারাতে বসেছে নদীর সৌন্দর্য। ব্রিটিশ আমলে বড় বড় জাহাজ চলতো যে নদীতে, সেই নদীতে এখন নৌকা চলাচল করাই দুষ্কর। বিভিন্নভাবে দখল, পৌরসভার আবর্জনা ও কচুরিপানা নদীর পানি গিলে খাচ্ছে। 

অচিরেই এই কচুরিপানা পরিষ্কার না করলে একসময় পানিও মিলবে না নদীতে। হাজার হাজার মাঝি-মাল্লা নৌকা নিয়ে ভিড়তো যে ঘাটে, সেই ঘাট এখন পানি শূন্য। যতটুকু পানি আছে, সেই পানিতে ভেসে আছে কচুরিপানা ও ময়লা আবর্জনা। পানির অভাবে নদীর বিভিন্ন জায়গায় টিলা সৃষ্টি হয়েছে।

এতক্ষণ যে পদ্মা নদীর কথা বলছিলাম, সেটি আর কোথাও অবস্থিত নয়। বলছিলাম গোয়ালন্দ উপজেলার বিহারীমারা কোল ও মাল্লাপট্টিখ্যাত পদ্মা নদীর কথা, যে নদীতে চলতো বড় বড় জাহাজ। নোঙর ফেলতো গোয়ালন্দ মাল্লাপট্টি নামক স্থানে। নদীর বুক থৈ থৈ করতো পানিতে। শত শত ব্যবসায়ী তাদের মালামাল জাহাজে করে নিয়ে আসতো গোয়ালন্দের এই ঘাটে। 

সেসব মালামাল গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেতো, এমনকি কলকাতাতেও অনেক দ্রব্যাদি পাঠানো হতো। এখন সেই নদী আর নেই। বর্ষা মৌসুমে একটু আধটু পানি হয়, তবে সে পানি দেড়-দুমাসের বেশি থাকে না। বছরের বেশির ভাগ সময়ই নদী কচুরিপানায় ভরে থাকে।

গোয়ালন্দ বাজারের পদ্মার মোড় থেকে বিহারীমারা কোল ঘেষে বাহাদুরপুর, মঙ্গলপুর, জামতলা, মাইজামিয়ার ডাঙ্গী হয়ে ফরিদপুর সদরের কামারডাঙ্গী এলাকা পর্যন্ত কচুরিপানা দখল করে রেখেছে নদী। যত্ন না নেওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে সোনালী অতীত। নদীর পুরো জুড়েই শুধু কচুরিপানা। এক ফোটা পানিও চোখে দেখার মতো অবস্থায় নেই। কচুরিপানার কারণে মৎস্যজীবী, জেলে এবং কৃষকদের চাষাবাদে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। 

কয়েক বছর ধরে কচুরিপানার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। দুই যুগ আগে মমিনখার হাট, কামারডাঙ্গী, মজলিশপুর, মহিদাপুর, চরকর্ণেশনা ও ফরিদপুর হতে ট্রলারযোগে কৃষিপণ্য আনা হতো। গোয়ালন্দ বাজারের সপ্তাহিক দুটি হাটের দিন সারি সারি নৌকা ও ট্রলার ঘাটে থাকতো। দিনশেষে মালামাল বিক্রি করে ট্রলারগুলো ফিরে যেতো।

ফরিদপুরসহ অন্যান্য স্থানের সাথে নদীর চলাচলের প্রবেশপথ থাকলেও এখন আর ট্রলার ও নৌকা দিয়ে কৃষিপণ্য আনা যায় না। বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়লেও কচুরিপানার কারণে সেসব ট্রলার ও নৌকা প্রবেশ করতে পারে না। ফলে গোয়ালন্দ বাজারের ব্যবসায় ক্ষতির ঢল নেমে এসেছে। 

বিশেষ করে প্রধান নদী হতে গোয়ালন্দ বাজার পর্যন্ত প্রবেশের জন্য ফরিদপুর ও গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর শেষ প্রান্তে কামারডাঙ্গী নামক স্থানে অপরিকল্পিত ব্রিজ নির্মাণের কারণে বর্ষা মৌসুমে ট্রলারগুলো প্রবেশ করতে পারে না।

এলাকার সচেতন নাগরিকদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন, “মরা পদ্মা” থেকে কচুরিপানা পরিষ্কার করা, পুনঃখনন ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করলে আগের মতোই এই নদী দিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্য আনা শুরু হবে। নদীর সৌন্দর্য জৌলুস ফিরবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও নদী গবেষণা কেন্দ্রগুলো যদি নদীর শাসন কার্যক্রম চালু করে, তাহলে নদীর প্রাণচঞ্চলতা ফিরে আসবে।

গোয়ালন্দ বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, আদ্দ্বীন কৃষি ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী ও তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা হুমায়ুন আহমেদ বলেন, “৩০-৩৫ বছর আগে ঢাকা ও ফরিদপুর হতে কৃষিপণ্য এই নদীপথ দিয়ে আনতাম। খরচও ছিল অনেক কম। ট্রলারযোগে খুব সহজেই মালামাল আনতাম। একবারে আমার দোকানের কাছেই ট্রলার চলে আসতো। কিন্তু কয়েক বছর হলো নদীতে কচুরিপানা থাকার কারণে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। মরা পদ্মার কচুরিপানা পরিষ্কার করলে বর্ষা মৌসুমে অন্তত কম খরচে সার ও কীটনাশক আনা-নেয়া সম্ভব হবে।”

তিনি আরও বলেন, “মরা পদ্মার জৌলুস ফেরাতে প্রশাসনের অতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোরও উচিত নদী থেকে কচুরিপানা অপসারণ করা।”

দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় দখল এবং পলি জমে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এসব পুনরুদ্ধার ও পুনঃখননের জন্য সরকার ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে খাল খনন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। গোয়ালন্দের যেসব খাল দখল হয়েছে, সেগুলো উদ্ধার এবং পলি ও আবর্জনায় ভরে গেছে নদীগুলো পুনঃখননের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কয়েক দিন আগে গোয়ালন্দে কৃষি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম যাচাই-বাছাই করতে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম জানান।

এএন