হাজীগঞ্জে মাছের আড়ৎ বন্ধ নিয়ে উত্তেজনা, হয়রানির শিকার ব্যবসায়ীরা

চাঁদপুর প্রতিনিধি  প্রকাশিত: এপ্রিল ২৩, ২০২৬, ১২:১৮ পিএম
হাজীগঞ্জে মাছের আড়ৎ বন্ধ নিয়ে উত্তেজনা, হয়রানির শিকার ব্যবসায়ীরা

সরকারি বিধি মেনে মালিকানাধীন জমিতে দীর্ঘ বছর ধরে পাইকারি মাছের ব্যবসা করে আসছেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার দেররা বাজারের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু একটি সংঘবদ্ধ চক্র ঐতিহ্যবাহী এই বাজারের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তারা পৌরসভা থেকে ইজারা আনার নামে ব্যবসায়ীদের চরম হয়রানি ও নির্যাতন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

পৌরসভার অধিগ্রহণভুক্ত কিংবা মালিকানা ছাড়া কোনো বাজার ইজারা দেওয়ার বিধি নেই এ বিষয়টি উল্লেখ করে উচ্চ আদালতে রিট করেছেন জমির মালিক ও এক ব্যবসায়ী। ইজারাদার ও ব্যবসায়ীদের বিরোধে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে আড়তগুলোর কেনাবেচা। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন এর সঙ্গে জড়িত কয়েক শতাধিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী।

সরেজমিন ঘুরে, ব্যবসায়ী সমিতির নেতা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

স্থানীয়রা জানান, ধেররা মাছের আড়তটি গত কয়েক বছর ধরে বৃহত্তর কুমিল্লা–চাঁদপুর অঞ্চলের মধ্যে পাইকারি মাছের বাজার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। ভোরের এক ঘণ্টার বাজারে কোটি টাকার লেনদেন হয় এই বাজারে। এতে ছোট-বড় প্রায় দেড় শতাধিক মাছের পাইকারি ব্যবসায়ী জড়িত। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানে জড়িত রয়েছে কয়েক শতাধিক লোক।

দেররা গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে সাখাওয়াত হোসেন এই মাছ বাজারের জমির মালিক ও ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, “আমরা ব্যক্তিরাই এই বাজারের জমির মালিক এবং পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্সধারী। প্রত্যেক ব্যবসায়ী ব্যক্তিগতভাবে সরকারকে ট্যাক্স দেন। কিন্তু ২০২৩ সাল থেকে এই বাজার পৌরসভা ইজারা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইজারা দেওয়ার এখতিয়ার নেই পৌরসভার। যে কারণে আমি নিজে উচ্চ আদালতে এসব বিষয় উল্লেখ করে রিট করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “আবেদনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতে রিটের শুনানি হয়। এতে বলা হয়, আবেদনকারী হাজীগঞ্জ পৌরসভার মধ্যে অবস্থিত জমির মালিক। পৌরসভা তাদের জমি অধিগ্রহণ না করে সম্পত্তি লিজ দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ফলে আদালত মালিকানাধীন জমি লিজ দেওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেন। বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভাকে অবহিত করা হয়েছে।”

এদিকে সম্প্রতি নতুন বাংলা সনে এই বাজার আবারও ইজারা নিয়েছেন হাসান বসির রানা নামে এক ব্যক্তি। তিনি চলমান বাজারে খাজনা আদায়ে এসে ব্যবসায়ীদের নানা হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের মারধর ও মামলা দিয়ে জুলুম-নির্যাতন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজে না এসে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে লোক পাঠিয়ে ব্যবসায়ীদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।

আদর্শ মৎস্য আড়তের মালিক শাহজালাল বলেন, “এই মাছ বাজারে ২৭ জন ব্যবসায়ী আছেন। ব্যবসায়ীদের সমিতিও রয়েছে। ব্যবসায়ী ও সমিতির সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো কিছু হয় না। আমরা কখনোই খাজনা দিয়ে অবৈধ ইজারাদারকে বৈধতা দেব না।”

দেররা মৎস্য আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রাধা কান্তি রাজু বলেন, “ইজারাদার ও ব্যবসায়ীদের বিরোধের মধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে আমাদের ৫ জন ব্যবসায়ীকে গত ১৯ এপ্রিল এক সভায় ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের উপস্থিতির স্বাক্ষর রাখা হয়। পরে জানতে পারি ওই সভার রেজুলেশনে বাজার সম্পর্কে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা মূলত স্বাক্ষর নিয়ে বড় ধরনের জালিয়াতি। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আশা করি ব্যক্তি মালিকানাধীন এই জমি নিয়ে পৌরসভা ইজারা বাতিল করে সুষ্ঠু সমাধান দেবে।”

এদিকে গত ১ বৈশাখ পৌরসভা থেকে প্রাপ্ত ইজারাদারের পক্ষে খাজনা আদায়ে লোকজন ধেররা বাজারে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া–পাল্টাধাওয়া ও হামলার ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি আহত হন। এরপর থেকে আড়তের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ১৮ এপ্রিল মানববন্ধন করেন মালিক ও ব্যবসায়ীরা।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, “ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে ব্যবসা করা যায়। তবে কেউ যদি সেখানে বাজার পরিচালনা করে, তাহলে ইজারা ও খাজনার বিষয় থাকতে পারে।”

এএন