লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলায় শৃঙ্খলা রক্ষার নামে সাধারণ মানুষের গায়ে হাত তোলা এবং লাঠি হাতে শাসন করার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আক্তার জাহানের বিরুদ্ধে।
বুধবার দুপুরে উপজেলার চাপারহাট এবং তুষভাণ্ডার এলাকার দুটি পৃথক পেট্রোল পাম্পে এসব ঘটনা ঘটে। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
ঘটনার শুরু বুধবার দুপুরে চাপারহাটের একটি ফিলিং স্টেশনে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ছড়িয়ে পড়া ভিডিও সূত্রে জানা যায়, পাম্পে জ্বালানি তেল নিতে আসা গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইনের শৃঙ্খলা তদারকি করছিলেন ইউএনও শামীমা আক্তার জাহান। এ সময় নদী রায় নামের এক তরুণ একটি মোটরসাইকেল নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ইউএনও যখন তাঁর কাগজপত্র পরীক্ষা করতে যান, তখন ফুয়েল কার্ডের ছবির সঙ্গে ওই তরুণের চেহারার মিল না পাওয়ায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ভিডিওতে দেখা যায়, ইউএনও প্রথমে ওই তরুণের শার্টের কলার ধরে টানাটানি করেন এবং এক পর্যায়ে তাঁকে সজোরে কয়েকটি থাপ্পড় মারেন। এরপর তিনি ওই তরুণের মোটরসাইকেলের চাবিটি কেড়ে নিয়ে নিজের জিম্মায় রাখেন।
ভুক্তভোগী নদী রায় পেশায় একজন মোটরসাইকেল গ্যারেজ কর্মচারী। তিনি জানান, জনৈক এক অসুস্থ ব্যক্তির অনুরোধে তাঁর ফুয়েল কার্ড ও মোটরসাইকেলটি নিয়ে পাম্পে তেল নিতে এসেছিলেন তিনি। নদী রায়ের ভাষ্যমতে, আমি ম্যামকে (ইউএনও) বারবার বলতে চেয়েছি যে আমি কার্ডের মালিক নই, কিন্তু তিনি কোনো কথা না শুনেই সবার সামনে আমাকে মারধর করেন এবং লাঞ্ছিত করেন।
পরে পাম্পে উপস্থিত সাধারণ মানুষ এই আচরণের প্রতিবাদ জানালে এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে প্রায় এক ঘণ্টা পর নদী রায়কে তাঁর চাবি ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
একই দিন কালীগঞ্জের তুষভাণ্ডার বাজারের অন্য একটি ফিলিং স্টেশনেও ইউএনও’র মারমুখী অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। সেখানে দেখা যায়, শৃঙ্খলা ফেরানোর নামে তিনি হাতে লাঠি নিয়ে বাইকারদের শাসাচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, পাম্পের সামনে থাকা একটি মোটরসাইকেল তিনি ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। এই ঘটনায় উপস্থিত জনতার তোপের মুখে পড়েন তিনি। প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এমন আচরণকে ‘অপেশাদার’ ও ‘মানহানিকর’ বলে অভিহিত করেছেন সাধারণ মানুষ।
পুরো ঘটনাটি নিয়ে ইউএনও শামীমা আক্তার জাহানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শারীরিক হেনস্তার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘কারও গায়ে হাত তোলার অভিযোগটি সত্য নয়। আমি শুধু ওই ব্যক্তির গাড়ির চাবি নিয়েছিলাম কারণ সম্ভবত তাঁর কাছে সঠিক কার্ড ছিল না। নিয়ম না মেনে লাইনে বিশৃঙ্খলা করার কারণে আমি চাবিটি জব্দ করে তাঁকে অফিসে যোগাযোগ করতে বলি। পরবর্তীতে তাঁর অভিভাবকরা আসার পর নিয়ম অনুযায়ী চাবিটি হস্তান্তর করা হয়েছে।
লাঠি হাতে শাসানোর বিষয়ে তিনি জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং দীর্ঘ লাইন সুশৃঙ্খল রাখতেই তিনি কঠোর অবস্থানে ছিলেন।
একজন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে জনসম্মুখে এভাবে গায়ে হাত তোলা বা শার্টের কলার ধরা দেশের প্রচলিত আইন ও শিষ্টাচারের পরিপন্থী বলে মনে করছেন সচেতন মহল। স্থানীয়রা বলছেন, যদি কারো কাছে সঠিক নথিপত্র না থাকে, তবে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কালীগঞ্জের সাধারণ মানুষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ভুক্তভোগীর মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জনগণের সেবক হওয়া উচিত, শাসক নয়।
প্রশাসনের কাজে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি হলেও তা যেন নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও আত্মসম্মান ক্ষুণ্ণ না করে, সেই দাবিই এখন কালীগঞ্জবাসীর। ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে বিভাগীয় পর্যায়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন