ভেড়ামারা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অতিরিক্ত মহাপরিচালকের আকস্মিক অভিযান, দুই কনসালটেন্টকে শোকজ

হেলাল মজুমদার, ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া)  প্রকাশিত: এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ০৬:২০ পিএম
ভেড়ামারা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অতিরিক্ত মহাপরিচালকের আকস্মিক অভিযান, দুই কনসালটেন্টকে শোকজ

নানা অনিয়মে জর্জরিত কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেছেন। এ সময় বহির্বিভাগে কোনো কারণ ছাড়াই অনুপস্থিত মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগের ২ কনসালটেন্টকে শোকজের নির্দেশও দিয়েছেন।

শনিবার বেলা ১১টার দিকে তিনি পরিদর্শনে আসেন। তিন ঘণ্টা অবস্থান শেষে দুপুর ২টার দিকে চলে যান।
মূলত ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা দূরীকরণ ও গত শুক্রবার রাতে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সৃষ্ট মনোমালিন্য নিরসনের জন্যই তিনি এই ঝটিকা পরিদর্শনে এসেছিলেন বলে জানান সাংবাদিকদের।

তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে প্রশ্ন তুললে সেগুলোর সত্যতা স্বীকার করে তা দ্রুত নিরসনের আশ্বাস দেন।

এ সময় সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনি হাসপাতালের বহির্বিভাগে অভিযান পরিচালনা করেন। সেখানে ৩ জন কনসালটেন্টের মধ্যে একজন উপস্থিত থাকলেও বাকি দুজন কোনো কারণ ছাড়াই অনুপস্থিত ছিলেন।

ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান বলেন, দুজন কনসালটেন্ট সপ্তাহে ৩-৪ দিন করে এবং একজন ৪-৫ দিন করে আসেন।

কিন্তু বিগত দুই মাস ধরে ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনুসন্ধান করে এর ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সেখানে মেডিসিনের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. কাজী নাজমুল হক শাওন সপ্তাহে রবি, সোম, বৃহস্পতি এই তিন দিন বহির্বিভাগে রোগী দেখেন। কিন্তু শনিবার তিনি ফিঙ্গার ও হাজিরা স্বাক্ষর দিয়ে চলে যান। সার্জারি বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. মো. ইকরামুল হক সপ্তাহে রবি ও বুধবার এই দুই দিন আসেন এবং অর্থোপেডিক্স কনসালটেন্ট ডা. মো. ওবায়দুর রহমান রবি ও বুধবার বাদে সপ্তাহে চারদিন আসেন। কিন্তু হাজিরা খাতায় উপস্থিতি স্বাক্ষরে গড়মিল লক্ষ্য করা গেছে।

এছাড়াও অনুসন্ধানে উঠে আসে, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীদের ইসিজি করাতে বাইরে থেকে ইসিজি মেশিন এনে জনপ্রতি ২৬০ টাকা করে নেওয়া হয়। বিষ খাওয়া রোগীর বিষ তোলার ক্ষেত্রে রোগী প্রতি ২-৩ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে ক্যাপাসিটির দোহাই দিয়ে জেনারেটর চালানো হয় না। রোগীদেরকে হাসপাতাল থেকে প্রদেয় অস্থায়ী বেডশিট না দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এছাড়াও রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাবার সামগ্রী প্রদান না করার অভিযোগও উঠে এসেছে।

নওদাপাড়ার ইদ্রিস আলীর মেয়ে নিলুফা ইয়াসমিন জানান, তার নিজের বিষ তুলতে ২ হাজার টাকা নিয়ে নিয়েছে হাসপাতালের লোকজন।

মোহন ইসলাম জানান, তার নিজের ও মায়ের ইসিজি করার জন্য বাইরে থেকে মেশিন এনে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। তিনি বারবার চেষ্টা করেও তাদের রুখতে পারেননি।

এদিকে শনিবার পরানখালি গ্রাম থেকে সেবা নিতে আসা আরিফা সুলতানা জানান, “বহির্বিভাগে এসেছি মেডিসিন ডাক্তার দেখাবো বলে, তিনি নাই। আমার সাথে আরও দুজন এসেছে ডাক্তার দেখাবে বলে, সেই ডাক্তারও আজকে আসেননি। কয়েকদিন ধরে ঘুরছি, কোনো লাভ হচ্ছে না।”

উপর্যুক্ত তথ্যসমূহ তুলে ধরে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মিজানুর রহমানকে প্রশ্ন করলে তিনি চুপ থাকেন।

এ সময় স্বাস্থ্যের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. জাহিদ রায়হান বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করতে জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম কামাল হোসেন ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমানকে নির্দেশ দেন। তিনি আরও বলেন, এরপরেও যদি এগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বিধি মোতাবেক প্রতিটি কনসালটেন্টকে ছয় দিন অফিস করার নির্দেশনা দেন। সরকারি নির্দেশ অমান্যকারীদের শোকজ করারও নির্দেশ দেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন, ভেড়ামারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ডা. গাজী আশিক বাহার এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান।

এছাড়াও স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব শাজাহান আলী, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম ডাবলু, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান জুয়েল ও সদস্য সচিব এস এস আল হুসাইন সোহাগ। এ সময় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসারবৃন্দ এবং স্থানীয় সংবাদকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।

অতিরিক্ত মহাপরিচালকের এই আকস্মিক সফরের পর স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার নতুন আশা সঞ্চার হয়েছে।

এএন