ময়মনসিংহে বাড়ছে ধর্ষণ আতঙ্ক, এক মাসে ২০ মামলা

আব্দুল্লাহ আল আমীন, ময়মনসিংহ প্রকাশিত: মে ৪, ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম
ময়মনসিংহে বাড়ছে ধর্ষণ আতঙ্ক, এক মাসে ২০ মামলা
প্রতীকী ছবি

ময়মনসিংহ জেলায় ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। পুলিশের নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল, এই তিন মাসে জেলায় মোট ৪৮টি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে। 

এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ৯টি, মার্চে ১৯টি এবং এপ্রিল মাসেই সর্বোচ্চ ২০টি মামলা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এপ্রিল মাসে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো নারী বা শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

মামলার এজাহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশু, কিশোরী ও তরুণী। পাশাপাশি বিবাহিত নারী, স্বামী প্রবাসে থাকা গৃহবধূ এবং সামাজিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকা নারীরাও এই অপরাধের শিকার হয়েছেন। 

কোথাও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে প্রতারণার মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে, কোথাও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্কের পর অস্বীকার করা হয়েছে। আবার অনেক ঘটনায় জোরপূর্বক ধর্ষণ, অপহরণের পর ধর্ষণচেষ্টা এবং পরিচিতজনের মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। 

একাধিক মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৯(১), ৯(৩), ৭/৯(১)/৩০ ধারায় মামলা হয়েছে। মামলাগুলোর অধিকাংশ আসামিদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

এপ্রিল মাসের মামলাগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোতোয়ালি মডেল থানা, ভালুকা, মুক্তাগাছা, নান্দাইল, ফুলপুর, হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া থানায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, শুধু শহর নয়, জেলার গ্রামীণ জনপদেও নারী ও শিশু নিরাপত্তা বড় সংকটে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ঘটনায় প্রভাবশালী মহল মামলা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে বহু পরিবার থানায় যেতে চায় না। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা নথিভুক্ত মামলার চেয়েও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ধর্ষণ এখন শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। অপরাধীরা জানে, বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগে, সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হয় এবং ভুক্তভোগীরা সামাজিক চাপে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগেই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পরিবারে নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি, মাদক বিস্তার, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া এবং দ্রুত বিচার না হওয়াই এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তারা বলছেন, শুধু পুলিশি অভিযান নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বসহ সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে শুধু মামলা গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়, প্রতিটি অভিযোগের পর দ্রুত তদন্ত, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং অভিযুক্তদের শনাক্তে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় রাখা হচ্ছে। 

একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। অপরাধ দমনে কঠোরতার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ দমনে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে বিশেষ টিম কাজ করছে। 

তিনি বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে এ অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়, এজন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সচেতন মানুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ময়মনসিংহবাসীর প্রশ্ন, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা কোথায়? অপরাধীরা বারবার কেন পার পেয়ে যায়? আদালত ও আইন প্রয়োগকারী প্রশাসনের কঠোর অবস্থান দৃশ্যমান হওয়ার দাবি নাগরিকদের। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জেলার সামাজিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা।

এএন