যশোরের বেনাপোল সীমান্ত ঘিরে স্বর্ণ, মাদক ও হুন্ডি পাচারের অভিযোগ নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে মাগুরা যুবদলের সভাপতি ওয়াসিকুর রহমান কল্লোলকে ঘিরে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিস্তৃত অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। এরই মধ্যে সংগঠনের তিন নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি।
শোকজ নোটিশে তিন নেতা হলেন- যশোর যুবদলের আনসারুল হক রানা, শহিদুল ইসলাম শহীদ ও মাগুরা যুবদলের সভাপতি ওয়াসিকুর রহমান কল্লোল। তাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উপস্থিত হয়ে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য, স্থানীয় সূত্র এবং একটি কথিত অডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাগুরা-ঢাকা রোড এলাকা রতন হোটেল থেকে শুরু করে বেনাপোলের পুটখালি, দৌলতপুর, ঘিবা, গোগা ও সাদিপুর রুট দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ পাচারের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশ থেকে আসা স্বর্ণ ঢাকায় এনে পরে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। একই পথে হুন্ডি ও মাদক পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে একটি চক্র ‘ভাই ভাই সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, বাহকরা ধরা পড়লেও মূল পরিচালকেরা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকে। এছাড়া কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে অল্প সময়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। বিলাসবহুল বাড়ি, একাধিক গাড়ি ও জমি ক্রয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
মাগুরা ও শালিখা উপজেলায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের তথ্য (অভিযোগ অনুযায়ী): সিমাখালী মাদ্রাসা-শতখালী পুরাতন বাজার ভায়া সোগাইরিন সড়কের উন্নয়ন কাজ, দিঘি ব্রিজ থেকে আতিয়ার বিশ্বাস শপ ভায়া মোটলেব কাজী হাউস সড়কের উন্নয়ন কাজ। এসব কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড (প্রোপ্রাইটর: মো. জাকাউল্লাহ, মোলা টাওয়ার, থানা মোড়, জীবননগর, চুয়াডাঙ্গা)-এর লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ নেওয়া হয় এবং পরে তা অন্য ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করা হয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি আরসিসি ড্রেন নির্মাণ প্রকল্পেও একই ধরনের অনিয়ম ও কাজ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কাজের মান নিম্নমানের এবং তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। তবে দপ্তরটি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
স্থানীয় সূত্র ও দলীয় নেতাকর্মীদের দাবি অনুযায়ী, ঠিকাদারদের কাছ থেকে সিডিউল জোরপূর্বক সংগ্রহ, কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায়, প্রায় ২০ লাখ টাকা নেওয়ার পরও কাজ না দেওয়া, মাগুরা পৌরসভার বাজার ইজারায় প্রায় ১৬ লাখ টাকা নিয়ন্ত্রণ- এমন নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত নেতার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে— মাগুরা জজকোর্ট সংলগ্ন হাজীপুর এলাকার বাসিন্দা ভাস্কর নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে জমি দখল করে নিজ অফিস নির্মাণ, আদালত চত্বরে আরও দুটি কক্ষ দখল, বিভিন্ন এলাকায় জমি দখল, ইটভাটা থেকে জোরপূর্বক ইট নেওয়া, আদালতে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের। এছাড়া শালিখার বাসিন্দা আলী আহমেদের মৃত্যুকে ঘিরে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগও উঠেছে।
তবে এ বিষয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়, অভিযুক্তরা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না বলেন, অপরাধ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ একত্রে যুক্ত হলে এসব চক্র আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বেনাপোল সীমান্তের স্বর্ণ পাচারের অভিযোগ এবং মাগুরার টেন্ডারবাজির অভিযোগ মিলিয়ে পুরো বিষয়টি এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন