বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মেজবাহ উদ্দীন আহমেদের সাম্প্রতিক এক টেলিভিশন টকশোতে চা-শ্রমিকদের নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন। সংগঠনটির দাবি, চেয়ারম্যানের বক্তব্যে চা-শ্রমিকদের সম্পর্কে নেতিবাচক, বিভ্রান্তিকর ও অবমাননাকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, যা শ্রমিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে এবং তাদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
রোববার দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সদর দপ্তর ‘লেবার হাউস’ এর মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী, বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা, কার্যকরী সভাপতি বৈশিষ্ট্য তাঁতী, জুড়ি ভ্যালির সভাপতি কমল বোনার্জী, সাংগঠনিক সম্পাদক কণ্ঠ তাঁতী, স্টাফ দুলাল হাজরাসহ বিভিন্ন চা-বাগানের পঞ্চায়েত নেতৃবৃন্দ।
নৃপেন পাল বলেন, এটিএন বাংলার চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ‘মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ চা বোর্ড চেয়ারম্যান চা-শ্রমিকদের দৈনিক কর্মঘণ্টা, উৎপাদনশীলতা এবং বাগান ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি অভিযোগ করেন, চেয়ারম্যান শ্রমিকদের এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন তারা নিয়মিত পূর্ণ কর্মঘণ্টা কাজ করেন না এবং মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা কাজ করেই দায়িত্ব শেষ করেন। অথচ বাস্তবে চা-শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের চা শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন।
তিনি আরও বলেন, চা-শ্রমিকরা প্রতিদিন নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা না থাকলে দেশের চা শিল্প আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারত না। অথচ চা বোর্ড চেয়ারম্যান একতরফাভাবে মালিকপক্ষের অবস্থানকে সমর্থন করে শ্রমিকদের দায়ী করেছেন, যা দুঃখজনক।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, চেয়ারম্যান তার বক্তব্যে দেশের অনেক চা বাগান লোকসানে রয়েছে এবং শ্রমিকদের কাজের অনীহা উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য করেন। তবে শ্রমিক ইউনিয়নের মতে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিভিন্ন বাগানে মজুরি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, আবাসন, চিকিৎসাসেবা ও শ্রমিক কল্যাণসংক্রান্ত নানা সমস্যা রয়েছে।
সংগঠনটি অভিযোগ করে, রাষ্ট্রায়ত্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানিসহ (এনটিসি) বিভিন্ন বাগানে শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, চা-শ্রমিকদের দোষারোপ করে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চা উৎপাদনের অবস্থান নিয়ে গর্ব করা আত্মবিরোধী। যদি শ্রমিকরা সত্যিই মাত্র ৩–৪ ঘণ্টা কাজ করতেন, তাহলে বাংলাদেশ কীভাবে বিশ্বে চা উৎপাদনে অষ্টম অবস্থানে পৌঁছাল?
নেতারা বলেন, প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চা-শ্রমিকরাই দেশের চা শিল্পের মূল ভিত্তি। তাদের শ্রমকে অবমূল্যায়ন করা অনুচিত এবং এটি শ্রমিক সমাজে হতাশা সৃষ্টি করছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের বক্তব্য প্রত্যাহার ও শ্রমিকদের কাছে দুঃখ প্রকাশের দাবি জানায়। পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, সম্মান ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, চেয়ারম্যানের বক্তব্য “বিভ্রান্তিকর, অবিবেচনাপ্রসূত ও অবমাননাকর”। তার ভাষায়, শ্রমিকরা দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরিতে অমানবিক পরিবেশে কাজ করছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৮ ঘণ্টার বেশি শ্রম দিতে হয়।
তিনি আরও বলেন, অনেক বাগানে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বিশুদ্ধ পানি, বিশ্রামের ব্যবস্থা ও প্রাথমিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। এমন বাস্তবতায় শ্রমিকদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য তাদের দীর্ঘ সংগ্রামকে অপমান করার শামিল।
এম জি
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন