দেশজুড়ে যেন এক অদৃশ্য আগুনের হলকা বইছে। চৈত্র-বৈশাখের চেনা রূপ ছাড়িয়ে জ্যৈষ্ঠের এই খরতাপ রূপ নিয়েছে এক তীব্র ও অসহ্য তাপদাহে। সকালের সূর্য ওঠার পর থেকেই আকাশ থেকে ঝরছে যেন তপ্ত আগুন।
দুপুরের দিকে সেই উত্তাপ এতটাই প্রকট হচ্ছে যে, পিচঢালা পথ থেকে শুরু করে গ্রামীণ মেঠোপথ- সবখানেই জনজীবন থমকে দাঁড়িয়েছে। শুধু ঢাকা নয়, দেশের আটটি বিভাগীয় শহরসহ প্রায় প্রতিটি জেলাই এখন কম-বেশি তাপপ্রবাহের কবলে।
প্রচণ্ড এই গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া, দিনমজুর ও মেহনতি মানুষ। একদিকে মাথার ওপরে জ্বলন্ত সূর্য, অন্যদিকে পেটের ক্ষুধা- এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চরম সংকটে পড়েছেন তারা।
বিভাগীয় শহরগুলোর তাপমাত্রার চিত্র
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই তাপদাহের তীব্রতা অঞ্চলভেদে ভিন্ন। তবে স্বস্তির খবর কোথাও নেই। আজকের আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেশের তাপমাত্রার একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে।
বরাবরের মতো এবারও তাপমাত্রার পারদে শীর্ষস্থান দখল করেছে চুয়াডাঙ্গা। আজ সেখানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৮.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র গরমে এ অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।
খুলনা ও রাজশাহী বিভাগ: চুয়াডাঙ্গার ঠিক পরপরই তপ্ত চুল্লির মতো জ্বলছে খুলনা ও রাজশাহী। আজ খুলনায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৮.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাজশাহীতে, পারদ ছুঁয়েছে ৩৭.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
রংপুর ও ঢাকা বিভাগ: উত্তরাঞ্চলের জেলা রংপুরে আজ তাপমাত্রা ছিল ৩৭.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে, জনবহুল রাজধানী 'ঢাকা মেগা সিটির কংক্রিটের জঙ্গল ও গাড়ির ধোঁয়ার সাথে মিশে আজ তাপমাত্রা ঠেকেছে ৩৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে ঢাকায় অনুভূত গরমের তীব্রতা (Heat Index) ছিল আরও অনেক বেশি।
বরিশাল ও ময়মনসিংহ: দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বরিশালেও ঢাকার মতোই তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর দেশের নতুন বিভাগ 'ময়মনসিংহে আজ সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ: ভৌগোলিক অবস্থান ও পাহাড়-প্রকৃতির কারণে কিছুটা কম তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে (৩৪.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। তবে সবচেয়ে কম তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চা-বাগানের অঞ্চল সিলেটে, সেখানে পারদ ছিল ৩২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যদিও আর্দ্রতার কারণে সেখানেও এক ধরনের ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে।
বৃষ্টির দেখা মিললেও কমবে না গরম
চলতি এই তীব্র তাপদাহের স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ দৈনিক আমার সংবাদকে এক গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস দিয়েছেন। তিনি জানান, দেশের বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও অন্তত দুই দিন অপরিবর্তিত থাকতে পারে। অর্থাৎ, চলমান এই তীব্র গরম থেকে এখনই পুরোপুরি মুক্তি মিলছে না।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, আজ (বুধবার) সন্ধ্যা অথবা আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে গুঁড়ি গুঁড়ি বা হালকা বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে এই সামান্য বৃষ্টিপাতে স্বস্তি মেলার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাবে, যা ভ্যাপসা গরমকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে তাপমাত্রা তাৎক্ষণিকভাবে কমবে না। সামগ্রিকভাবে দেশের তাপমাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে এবং গরমের তীব্রতা পুরোপুরি কমতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে।
আবহাওয়া অফিসের এই পূর্বাভাস সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর করেছে। বিশেষ করে যারা আশা করেছিলেন এক পশলা বৃষ্টি হলেই হয়তো পরিবেশ শীতল হবে, তাদের জন্য এই ভ্যাপসা গরমের সতর্কবার্তা নতুন অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শ্রমজীবী ও দিনমজুরদের চরম ভোগান্তি
এই তীব্র তাপদাহে এসি রুমে থাকা উচ্চবিত্ত বা ফ্যানের নিচে বসা মধ্যবিত্তের জীবন যেখানে ওষ্ঠাগত, সেখানে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, কুলি এবং নির্মাণ শ্রমিকদের অবস্থা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। প্রচণ্ড উত্তাপের কারণে তারা মাঠে কিংবা রাস্তায় টিকে থাকতে পারছেন না।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় দুপুরের কড়া রোদে রিকশার হুড তুলে জিরিয়ে নিচ্ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব রহমত আলী। কপালের ঘাম মুছতে মুছতে তিনি বলেন, বাবা, রাস্তায় রিকশা চালানো তো দূরের কথা, সিটে বসার উপায় নাই। পিচ থেকে এমন গরম ভাপ বের হচ্ছে যে চোখ-মুখ পুড়ে যায়। দিনে যেখানে ৭০০-৮০০ টাকা আয় করতাম, এখন গরমে টিকতে না পেরে ৩০০ টাকাও কামাইতে পারছি না। এই টাকা দিয়া চাল কিনমু, না ঘরের ভাড়া দিমু?
অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে দেশের বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবনে। তীব্র রোদের কারণে দুপুরের দিকে ছাদ ঢালাই বা ইট গাঁথুনির কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন শ্রমিকরা। এতে দৈনিক চুক্তিতে কাজ করা শ্রমিকরা হারাচ্ছেন তাদের মজুরি। খেতখামারে কাজ করা কৃষকরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। সকাল ১০টার পর রোদের তাপে জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ফলে ফসলের পরিচর্যা ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘরে ঘরে নীরব হাহাকার
করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বমূল্যের বাজারে সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষের পিঠ এমনিতেই দেয়ালে ঠেকে ছিল। তার ওপর এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা তাপদাহ তাদের উপার্জনে বড় ধরনের কুঠারাঘাত করেছে। কাজ করতে না পারায় অনেক পরিবারের দৈনিক আয় নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়।
শহরের বস্তি এলাকা ও প্রান্তিক গ্রামগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক দিনমজুরের ঘরে দুবেলা উনুন জ্বলছে না। সঞ্চয় বলতে কিছু না থাকায়, ধারদেনা করে কিংবা একবেলা খেয়ে দিন পার করছেন অনেকে। নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাওয়ার এই চিত্র এখন দেশের আনাচে-কানাচে দৃশ্যমান। একদিকে পুষ্টিকর খাবারের অভাব, অন্যদিকে তীব্র গরমে বিশুদ্ধ পানির সংকট- সব মিলিয়ে এক মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
প্রচণ্ড এই তাপদাহের কারণে দেশজুড়ে ডায়রিয়া, জন্ডিস, গ্যাস্ট্রিক এবং হিট স্ট্রোকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা এই আবহাওয়ায় দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। হাসপাতালগুলোতে পানিবাহিত রোগ ও গরমে অসুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন:
১. পর্যাপ্ত পানি পান: শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে দিনে অন্তত ৩-৪ লিটার নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। প্রয়োজনে খাবার স্যালাইন খাওয়া যেতে পারে।
২. রোদ এড়িয়ে চলা: দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খুব বেশি প্রয়োজন না হলে রোদে বের না হওয়াই ভালো। বাইরে বের হলে অবশ্যই ছাতা, টুপি এবং সানগ্লাস ব্যবহার করা উচিত।
৩. সুতি পোশাক: গরমে আরাম পেতে ঢিলেঢালা ও হালকা রঙের সুতি কাপড় পরিধান করা শ্রেয়।
৪. বাসি ও খোলা খাবার বর্জন: এই গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তাই রাস্তার খোলা শরবত, ফুচকা-চটপটি বা বাসি খাবার খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে মানুষ আজ অসহায়। তবে এই সংকটের সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবিক সহমর্মিতা। বিত্তবানদের উচিত এই তীব্র তাপদাহে কর্মহীন হয়ে পড়া ও সংকটে থাকা দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যদি এই প্রান্তিক মানুষের জন্য সাময়িক খাদ্য ও আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে হয়তো এই কঠিন দুর্যোগ কিছুটা হলেও তারা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। প্রকৃতির নিয়মেই এক সপ্তাহ পর হয়তো মেঘের ঘনঘটা আসবে, নামবে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি, শীতল হবে ধরিত্রী- কিন্তু ততক্ষণে যেন ক্ষুধার জ্বালায় কোনো শ্রমজীবী মানুষের সংসার নিঃস্ব না হয়ে যায়, সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন