লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন এক মা ও তার তিন মেয়ে। বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ১১টার দিকে পৌরসভার গোডাউন রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এ ঘটনা ঘটে।
ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হওয়ার পর একে একে মারা যান শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)।
ঘটনার পর অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে স্থানীয়রা আটক করে গণপিটুনি দিলে তিনিও পরে মারা যান। অন্তরের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় বলে জানা গেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার সকালে অন্তর মজুমদার ধারালো অস্ত্র নিয়ে শাহিনুর বেগমের বাসায় প্রবেশ করেন। বাড়ির মালিক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক জানান, অন্তর তার স্ত্রীকে নিয়ে প্রায় দেড় বছর ওই এলাকায় ভাড়া থাকতেন। প্রায় সাত থেকে আট মাস আগে তিনি ওই বাসা ছেড়ে চলে যান।
পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে সেদিন সকালে তিনি ওই বাসায় গিয়েছিলেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
প্রতিবেশী রাণী নামে এক নারী জানান, বাসার সামনে অন্তরকে দেখে তিনি তার পরিচয় জানতে চান। জবাবে অন্তর বলেন, তিনি পানির পাইপ মেরামতের কাজে এসেছেন।
তবে তার আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় রাণী বাসার কলাপসিবল গেট আটকে দেন এবং স্থানীয়দের বিষয়টি জানান।
এর কিছুক্ষণ পরই ঘরের ভেতরে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পুলিশ বলছে, সকাল পৌনে ১১টা থেকে সোয়া ১১টার মধ্যে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্তর ধারালো অস্ত্র দিয়ে শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়ের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালান।
দুপুরের দিকে ঘরের ভেতর থেকে চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। পরে বাসার ভেতরে প্রবেশ করে তারা চারজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের উদ্ধার করে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
প্রতিবেশী এক নারী জানান, চিৎকার শুনে তিনি বাসার সামনে গিয়ে ডাকাডাকি করেন। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। পরে জানালা দিয়ে একজন ব্যক্তিকে রান্নাঘরের দিকে যেতে দেখেন।
প্রথমে তিনি ধারণা করেছিলেন, লোকটি হয়তো পরিবারের কোনো আত্মীয়। পরে গেটের কাছে গিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে সে নিজেকে বাথরুমের ট্যাপ মেরামতের কর্মী বলে পরিচয় দেয়।
দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পর তার সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। এরপর তিনি আশপাশের লোকজনকে ডাকতে শুরু করেন।
স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে এসে ঘরের মেঝেতে রক্তের দাগ এবং চারজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেন।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মামুনুর রশিদ জানান, শাহিনুর বেগম ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তারকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর মারা যান সায়মা আক্তার।
অন্যদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে কুমিল্লায় মারা যান ইকরা আক্তার। হামলার পর অন্তর মজুমদার পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে আটক করেন।
পরে উত্তেজিত জনতা তাকে গণপিটুনি দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
জানা গেছে, নিহতদের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তারা দীর্ঘদিন ধরে রায়পুর পৌর শহরের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।
কয়েক বছর আগে পরিবারের কর্তা কামাল হোসেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর শাহিনুর বেগম এক ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার পরিচালনা করে আসছিলেন।
নিহত সায়মা আক্তার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন। ইকরা আক্তার রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। আর ছোট মেয়ে শিফা আক্তার স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
ঘটনার বিষয়ে লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক বলেন, স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী অন্তর মজুমদার ওই বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তবে কী কারণে এমন ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তিনি জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। অভিযুক্তকে স্থানীয়রা ঘটনাস্থলেই আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
পুলিশ সুপার বলেন, পুরো ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত করা হচ্ছে এবং তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন