ড. জিয়াউদ্দিন

স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে বাড়ি বাড়ি যাবেন স্বাস্থ্যকর্মীরা

ঝালকাঠি প্রতিনিধি প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০১:০৮ পিএম
স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে বাড়ি বাড়ি যাবেন স্বাস্থ্যকর্মীরা

দেশে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে বর্তমান স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে নতুন করে ১ লাখ কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।

তিনি বলেন, বিদ্যমান ৪১-৪২ হাজার ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে নতুন নিয়োগ মিলিয়ে দেশে মোট ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করবেন। এতে প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার দেশের প্রতিটি পরিবারে একজন স্বাস্থ্যকর্মী পৌঁছে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা দেবেন।

মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ (CIRDAP) মিলনায়তনে "হার হেলথ বাংলাদেশ: নারী স্বাস্থ্য, মাতৃস্বাস্থ্য ও ক্যান্সার স্ক্রিনিং কর্মসূচি জোরদারকরণ" শীর্ষক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, দেশে বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান প্রসবের হার প্রায় ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান প্রসব মা ও নবজাতকের জন্য অপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ প্রবণতা রোধে চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মা ও নবজাতকের নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা, দক্ষ প্রসূতি সেবা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। কেবল চিকিৎসাগত প্রয়োজন দেখা দিলেই সিজারিয়ান অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তদারকি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান নিরুৎসাহিত করতে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট (এফডব্লিউএ) এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপিদের একীভূত করে "কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার" নামে একটি সমন্বিত কর্মীবাহিনী গঠন করা হবে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা দেবেন, যার মধ্যে জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিংও থাকবে। ক্যান্সার শনাক্তের জন্য আলাদা কর্মীবাহিনী গঠন করা হবে না। বরং বিদ্যমান স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে এই সেবা নিশ্চিত করা হবে।

রেফারেল ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে স্ট্যান্ডার্ড কেয়ার পাথওয়ে, ডিজিটাল রেফারেল ও কেস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি রোগী পরিবহনের জন্য তিন স্তরের বৈদ্যুতিক অ্যাম্বুলেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম স্তরের অ্যাম্বুলেন্স গ্রাম থেকে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে, দ্বিতীয় স্তরেরটি উপজেলা থেকে জেলা হাসপাতালে এবং তৃতীয় স্তরের বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্স আইসিইউ সুবিধাসহ গুরুতর রোগীদের ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে যাবে।

দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ইলেকট্রনিক হেলথ আইডি বা ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড চালু করা হবে। এটি একটি সমন্বিত পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, যেখানে রোগীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং ডিজিটাল রেফারেল ব্যবস্থার মাধ্যমে রোগীকে সঠিক সময়ে সঠিক হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হবে। স্বাস্থ্য খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)নির্ভর ডিজিটাল ব্যবস্থা, শক্তিশালী ডেটা সিস্টেম, উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা, মান নিশ্চিতকরণ এবং বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) বিষয়ে ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলেও বড় হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সক্ষমতাকে কাজে লাগানো হবে। সরকার ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা কৌশলগতভাবে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে কিনে নেওয়ার নীতির দিকে এগোবে, যাতে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমে এবং দারিদ্র্যে পতিত হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে এমনভাবে সক্ষম করে তোলা হবে, যাতে সেখানে ক্যান্সার নিশ্চিতকরণ, বায়োপসি এবং প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে কমিউনিটি পর্যায় থেকে উপজেলা পর্যন্ত একটি সমন্বিত সেবা প্রবাহ (ইন্টিগ্রেটেড কেয়ার পাথওয়ে) গড়ে তোলা হবে, যাতে রোগীরা সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান।

সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতসহ স্বাস্থ্যখাতের নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এএন